আলোকিত মানুষ হাজী ইয়াকুব আলী ভূইয়া

 

www.mamin71.com Wednesday, April 15, 2020 0
প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত তাঁজপাড়া গাঁয়ে জন্ম দিয়েও দক্ষতা, কর্মকুশলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় একজন ব্যক্বিত যে আলোকিত মানুষে পরিনত হতে পারেন কুমিল্লার মুরাদনগরের হায়দরাবাদের মরহুম হাজী মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া তার কস্টার্জিত সম্পদ তিনি অকাতরে দান করেছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মা। তার কল্যাণে তাই তিনি ইন্তেকাল করার পরও সকলের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পেতে বসে আছেন।
জন্ম ও পরিচয়ঃ তিনি ১৯০৬ সালে মুরাদনগরের হায়দরাবাদের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়া। মাতার নাম পহরেন্নেসা। তার পিতা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
শিক্ষাঃ তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয় বা পাঠশালার সঙ্কট ছিল। এছাড়া লেখাপড়ার প্রতি জনসাধারন তেমন গুরুত্ব দিত না। তবে বালক ইয়াকুবের পিতা শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তিনি ছেলেকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানে কার্পন্য করেন নি।
কর্মজীবনে প্রবেশঃ তিনি দেবিদ্বার থানার গঙ্গামন্ডল পরগনার খাজনা আদায়ের কাজে নিয়োজিত হন। তখন তিনি ছগুড়া, চালবরপাড়া, গাদানগর, কালিকাপুর, হোসেনপুর, পিরোজপুর ও খয়রাবাদের জনগনের নিকট তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ বাজারে সুতার ডাইয়িং মিল পরিচালনা করেন। এছাড়া যমুনা তেলের এজেন্সির স্বত্বাধিকারী ছিলেন। কসবা থানার বাদুরেও তার ডাইং মিল ছিল। ১৯৫১ সালে তার জীবনে পরিবর্তন আসে। তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম চলে যান।
চট্রগ্রাম গিয়ে জীবনের গোড় ঘুরে গেল। তিনি প্রথমে ক্যাসিকেল (এসিড) ব্যবসার সাথে জড়িত হন। সেই সুবাদে তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম এসিড ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম ডিডি ফ্যাক্টরির সোল এজেন্ট ছিলেন।
এছাড়া টিএসপির সোল এসেন্ট, কর্ণফুলি পেপার মিলের সোল এজেন্ট, মনির ক্যনমিলসেন্সের সোল এজেন্ট ও রানী মার্কা ঢেউ টিনের সোল এজেন্ট ও ক্যামিক্যাল ইমপর্টার ছিলেন। তিনি জাপান, কোরিয়া ও জার্মান থেকে ক্যামিকেল আমদানী করতেন। তিনি দি আজাদ কালার কোম্পানী, আজাদ ক্যামিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রি, ওসমানিয়া ট্যানারি, ও হোটেল হাওয়াই এর সাথে জড়িত ছিলেন।
শিক্ষা বিস্তার ঃ তিনি অত্র এলাকার শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ১৯৫২ সালে আকবপুর হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় ৭০০ টাকা দান করেন। ১৯৭৯ সালে বিদ্যালয়টির উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখেন এবং তার নামে এর নামকরণ করা হয়। তিনি এককভাবে হায়দরাবাদে ইয়াকুব আলী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এতে এলাকার ছাত্ররা বিশেষ করে ছাত্রীরা লেখাপড়ার সুযোগ পায়। তিনি ১৯৭২ সালে শ্রীকাইল কলেজে দশ হাজার টাকা দান করে দাতা সদস্য হিসেবে কলেজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। এচাড়া তিনি পাঁচলাইশ বালিকা বিদ্যালয়ের ডোনার, বাইড়া আরিফ স্কুল এন্ড কলেজেও তিনি অর্থ দান করেছেন।
ধর্মীয় শিক্ষা ঃ ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে তিনি মাদ্রাসা স্থাপন করেছেন। তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালে আকবপুর মোহাম্মদীয়া সিনিয়র মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি পাহাড়পুর, খামারগাঁও, কোম্পানীগঞ্জ ও মুরাদনগর, মোজাফ্ফারুল উলুম মাদ্রাসায় তিনি আর্থিক সহযোগীতা করেন।
স্বাস্থ্যঃ তিনি ১৯৬৫ সালে মায়ের নামে নিজ গ্রামে গড়ে তুলেন পহরেন্নেসা পল্লী স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র। এতে গরীব লোকেরা বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পায়। তিনি চট্টগ্রাম শিশু হাসপাতালের আজীবন সদস্য, পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের মেম্বার এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম ডায়বেটিক হাসপাতালের ডোনাং ছিলেন।
রাস্তাঘাট ঃ ইয়াকুব আলী ভূইয়া করইবাড়ি থেকে হায়দরাবাদ পর্যন্ত রাস্তা নির্মানে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এ রাস্তা নির্মানের সময় জমির গালিকগন ১৭টি সমালোচনা করেন। তখন এমপি ছিলেন আজিজুর রহমান এবং এস, এস এ হারুনুর রশিদ। কুমিল্লা এসডিও ছিলেন ওসমান আলী। তাদের সহযোগীতায় আধা কিলোমিটার জায়গা পান এবং মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে তিনি হাজী ইয়াকুব আলী ভূইয়া সড়ক নির্মান করেন। এছাড়াও পরবর্তীতে রাস্তাটির উন্নয়নে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। এছাড়া বাদামতলী সিদ্দিগঞ্জ বাজার রাস্তা নির্মানে তার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
খেলাধুলা ঃ তিনি এলাকার ছেলে মেয়েদের খেলাধুলার সুবিধার্থে একটি মাঠের ব্যবস্থা করেন। হায়দরাবাদ মোসাম্মৎ আমেনা খাতুন মাঠের নামে তিনি ১৯৮৭ সালে ৯০ শতক জায়গা দান করেন।
আর্তমানবতার সেবা ঃ ১৩৬০ বঙ্গাব্দে তিনি গরীব-দুঃখী মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন এবং বহু অর্থ ব্যয় করেন। ১৯৭৪ সালের বন্যার সময় ৬ মাস ধরে তার বাড়িতে খানার ব্যবস্থা করেন। এতে, প্রতিদিন ৫ মন ডাল ও চাল লাগত। এছাড়া ২১টি ইউনিয়নে অর্থ সাহায্য দেন। ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় তিনি ১০০ কম্বল, আড়াই মন চিড়া ও ১ মন গুড় গরীবদের মধ্যে বন্টন করেন। সর্বশেষ ২০০২ সালের বন্যায় আন্দিকুট ইউনিয়নে ১টন চাল, শাড়ি, কাপড়, লুঙ্গি, ৩ টন গম, লবন, দিয়াশলাই, বিস্কুট, চিড়া, গুড় বিতরণ করেন।
কৃষিঃ তিনি ১৯৮৬ সালে হায়দরাবাদে ডিপটিউবওয়েল স্থাপন করে স্বল্পমূল্যে কৃষকদের পানির ব্যবস্থা করেন। কৃষকদের সুবিধার্থে ১৯৮৭ সালে জমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে নিজ বাড়িতে এটাস্টেশন কোর্ট স্থাপন করেন।
অর্থ ও বাণিজ্য ঃ তিনি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতিশীলতা আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নেন। এজন্য ১৯৮৬ সালে নিজ বাড়িতে কৃষি ব্যাংকের শাখা স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি ১৯৬২ সালে হায়দরাবাদে ৩নং আন্টিকুট ইউনিয়নের কার্যালয় স্থাপন করেন। ১৯৭২ সালে ভূমি অফিস এবং ২০০২ সালে ডাকঘর স্থাপন করেন।
ধর্মঃ তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক ছিলেন। তিনি ১৯৮৪ সালে পবিত্র হজ্জ্ব সম্পাদন করেন। আকবপুরে পাকা মসজিদ নির্মান করেন। চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ্ জামে মসজিদে এবং বাদামতলী জামে মসজিদ নির্মান ও পুননির্মানে বিশেষ অবদান রাখেন। এছাড়া হায়দরাবাদ আবুল খায়ের ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমান অর্থ প্রদান করেছেন।
জাতীয় পর্যায় অবদানঃ তিনি স্বীয় প্রচেষ্টায় নাইট্রিক এসিড উৎপাদন করেছেন। ক্যামিস্ট হিসেবে ডিস্টিলওয়াটার, পিনাইন, ফসফরিক, সালফিউরিক, এসিড রিফাই করেছেন। তিনি ১৯৮৫ সালে গাজিপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরীর বাংলাদেশ সেনা বাহিনী পক্ষ থেকে ১৩৫০ নাইট্রিক এসিড ডাইনোশন করে ১০০ পাত্তারে আনার জন্য গোল্ড সেডেল লাভ করেন।
তিনি ১৪ আগস্ট ২০০৮ইং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ১০২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি ৩টি বিয়ে করেছিলেন। তার ১৭ জন ছেলেমেয়ে বর্তমানে স্ব স্ব কর্মস্থলে প্রতিষ্ঠিত। তিনি পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে কর্মজীবনে সাফল্য পেয়েছেন। তিনি পাকিস্তান আমলে কুমিল্লা জজ কোর্টের জুড়ি বোর্ডের মেম্বার হওয়ার গৌরব লাভ করেছেন।
MAMIN71.COM
www.mamin71.com

Post a Comment

0 Comments