পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম করি কাজী নজরুল ইসলামের, আর তার দুই স্ত্রী নার্গিস ও প্রমীলা হচ্ছেন পূর্ব বাংলার দৌলতপুর ও তেওতার মেয়ে।
প্রথমেই আসে নার্গিস অধ্যায়। এই আলোচনায় যার নাম প্রথমে আসে তিনি হচ্ছেন ঢাকা কলেজ থেকে বিএ পাস করে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরের খাঁবাড়ির সন্তান আলী আকবর খান। কাজী নজরুল ইসলাম ও আলী আকবর খান উভই প্রথম বিশ^যুদ্ধ-ফেরত সৈনিক। উভয়ের আশ্রয় তখন কলকাতায়। কাজী নজরুলের আশ্রয় বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির অফিসে। এখানে তার সহবাসী কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ এবং সাহিত্র সমিতি পত্রিকার প্রকাশক আফজাল উল হক। পাঠ্যপুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খান এখানে এসে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন। আলী আকবর খানের উদ্দেশ্য ছিল কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়ে পাঠ্যপুস্তক লিখিয়ে নিয়ে ব্যবসা করা। বিষয়টিকে মুজাফ্ফর আহমদ ভালো চোখে দেখেননি।
একদিন আলী আকবর খান জানালেন তিনি গ্রামের বাড়ি যাবেন। ইচ্ছা করলে কাজী নজরুল ইসলাম তার সাথে কুমিল্লায় বেড়িয়ে আসতে পারেন। ঝোঁকের মাথায় কাজী নজরুল ইসলাম রাজি হয়ে কলকাতার শিয়ালদহ-গোয়ালন্দ-চাঁদপুর হয়ে ২১শে চৈত্র ১৩২৭ কুমিল্লায় চলে আসেন। ওঠেন আলী আকবর খানের জিলা স্কুলের ক্লাসমেট (বন্ধু) বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কান্দিরপাড়ের বাসায়। বীরেন সেনগুপ্ত কুমিল্লার কোর্ট আব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। বড়ভাই জগৎকুমার সেনগুপ্ত তেওতায় থাকেন। মেজোভাই বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরাতেই কেরানির চাকরি করতেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী (প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান, তিনিও তেওতায় থাকতেন) তেওতার মেয়ে গিরিবালা দেবীও প্রাইমারি পাস একমাত্র মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তাকে রেখে স্বর্গবাসী হয়েছেন। তেওতা থেকে গিরিবালা তার মেয়ে আশালতাকে নিয়ে কুমিল্লায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন দেবর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কান্দিরপাড়ের বাসায়।
দিন দুয়েক বেড়িয়ে কুমিল্লা থেকে ট্রেনে ও হেঁটে ২৩শে চৈত্র বিকেলে এসে পৌছেন দৌলতপুরে। দৌলতপুরের এই আফগান-পাঠান খাঁ পরিবারের লোকেরা ছিলেন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান ও অভিজাত। বিহার থেকে বর্ধমানের চুরুলিয়ার আসা বিচারক বা কাজী পরিবারের নজরুল এসলামও ছিলেন আভিজাত্যে গরীয়ান। তখন আলী আকবর খাঁর বাড়িতে পাকা ভবন না থাকলেও (পরে অবশ্য দোতলা ভবন নির্মিত হয়েছিল) চমৎকার টিনের ঘরে কাজী নজরুল ইসলাম আরামেই কাটাতেই থাকলেন আমোদ-ফুর্তি, ঘোরাঘুরি আর লেখালেখি করে। দৌলতপুরে এসে তিনি ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদি রচনা করে প্রায় আড়াই মাস কাটিয়ে দেন। এখানে প্রেম হয় সৈয়দা খাতুনের সাথে। সৈয়দা খাতুন (দুবরাজ) হচ্ছে আলী আকবর খানের বিধবা বোন (স্বামী গ্রামের মুন্সি আবদুল খালেক) আসমাতুন্নেছার মেয়ে। আসমাতুন্নেছার ছেলেরা হলেন আবদুল জব্বার, আবদুর রহিম ও আবদুস সামাদ। গ্রামের উচ্চ প্রাইমারি পাস, ষোড়শী ও বিদুষী অনিন্দ্যসুন্দরী সৈয়দা খাতুনের সাথে ঘন ঘন দেখ-সাক্ষাতের ফলে কলকাতা থেকে এই গ্রামে বেড়াতে আসা যুবক কাবি ও সাংবাদিক কাজী নজরুল ইসলামের সাথে নার্গিসের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আলী আকবর খানের বড় ভাই নেজাবত আলী খান গ্রামের বাড়িতে থেকে চাষবাস করতেন। তার মেয়ে আম্বিয়া খাতুনের সাথে নার্গিসের বড়ছাই আবদুল জব্বারের বিয়ে হয়। খাঁবাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে নার্গিসের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই সৈয়দা খাতুন দবরাজের নাম দেন নার্গিস। নার্গিস নামেই আজ তিনি পরিচিত। কাজী নজরুল ইসলামের আগ্রহে নার্গিসের সাথে দৌলতপুরে বিয়ে হয় ১৩২৮ বাংলার ৩রা আষাঢ় শুক্রবার। কাজী নজরুল ইসলামের মুসাবিদায় ছাপানো দাওয়াতপত্রটি বিতরণ করা হয় আলী আকবর খানের নামে। সেই বিয়েতে আলী আকবর খানের দাওয়াতে কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে দৌলতপুরে এসেছিলেন মোট দশ জন। তাঁরা হলেন-১) ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, ২) বিরজাসুন্দরী দেবী (ইন্দুকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী), ৩) বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ( আলী আকবর খানের বন্ধু), ৪) কমলিনী সেনগুপ্ত (বীরেন বাবুর স্ত্রী), ৫) প্রবীর কুমার সেনগুপ্ত (বীরেন বাবুর শিশু পুত্র), ৬) কমলা সেনগুপ্তা (বীরেন বাবুর বোন), ৭) অঞ্জুলি সেনগুপ্তা (বীরেন বাবুর বোন), ৮) সন্তোষকুমার সেন (বিরজা দেবীর বোনের ছেলে), ৯) গিরিবালা সেনগুপ্তা (বীরেন বাবুর কাকি), ও ১০) আশালতা সেনগুপ্তা (গিরিবালা সেনগুপ্তার ১৩ বছর বয়স্কা কন্যা, যিনি পরে হন প্রমীলা নজরুল)।
কাজী নজরুল ইসলাম ও নার্গিসের বিয়ে পড়িয়েছিলেন নার্গিসের বড় ভাই মুন্সি আবদুল জব্বার। বিয়ের উকিল বলেন নার্গিসের বড়মামা আলতাফ আলী খান। বরের পক্ষে স্বাক্ষী মরমী কবি সাদত আলী মাস্টার (নার্গিস তার কাছে হারমোনিয়াম বাজনো ও গান শিখেয়েছিল) এবং কনের পক্ষে স্বাক্ষী সৈয়দ আলী মাস্টার। বিয়ের দেনমোহর ছিল পঁচিশ হাজার টাকা। দেনমোহর ও দৌলতপুরে অবস্থান করার সর্ত নিয়ে আলী আকবর খানের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের মনোমালিন্য ও রাগারাগি হয়। ফলে বিয়ের পর ভোরে বীরন্দ্রে কুমার সেনগুপ্তের সাথে কাজী নজরুল ইসলাম দৌলতপুর ত্যাক করে কুমিল্লা চলে আসেন। দৌলতপুর থেকে চলে আসার পাক্কালে সময় ও সুযোগমতো নার্গিসকে কলকাতায় নিয়ে যাবেন বলে যানিয়ে আসেন।
কুমিল্লায় এসে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় বীরজা দেবীর পরিবারের সবাই তার সেবযতœ ও দেখাশোনা করেন। বালিকা প্রনিলার সাথে সেই সময় কবির ঘনিস্টতা হয়। তখন প্রনীলাকে কাজী নজরুলের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে এটা কারো মাথায় ছিল না।
অসুস্থতার খবর পেয়ে মুজাফ্ফর আহমদ কলকাতা থেকে ৬ই জুন কুমিল্লায় আসেন এবং ৮ই জুন (১৯২১) কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। কাজী নজরুল ইসলাম পরে আবার কুমিল্লায় আসেন। বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত সে সময় তার চাকরিস্থল কলকাতায় ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে মানিকগঞ্জের তেওতা হয়ে যাবেন ঠিক করে স্টিমারে উঠেন। সাথে চলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সে সময় প্রমিলা ও গিরিবালা দেবী কুমিল্লাতেই ছিলেন। সেই সময় কয়েকদিন বীরেন বাবুর সাথে কবি নজরুল তেওতায় অবস্থান করেছিলেন। বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের বাড়ির পাশেই তেওতা জমিদারবাড়ি। সে বাড়িতে সময় কাটিয়ে লেখালেখি করে কয়েকদিন অতিবাহিত করার পর চলে যান কলকাতায়।
পরের খবর ১৯২২ সালে ধমকেতু পত্রিকায় পূজ্য সংখ্যায় আনন্দময়ীর আগমন শিরোনামে কবিতা লেখার জন্য কাজী নজরুল ইসলাম রাস্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। গ্রেফতার এরাতে তিনি কলকাতা থেকে পালিয়ে চলে আসেন সরাসরি তেওতায়। তিনি বেবেছিলেন গিরিবালা দেবী, প্রমিলাসহ বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের পরিবারের লোকজন পূজার এই সময় গ্রামের বাড়ি তেওতায় থাকতে আরেন। কিন্তু সে ছুটিতে কুমিল্লা থেকে কেউ তেওতায় আসেননি। তখন তিনি স্টিমারে চড়ে আবার চলে আসেন কুমিল্লা। কুমিল্লা থেকেই ২৩শে নভেম্বর ১৯২২ তিনি গ্রেফতার হন। এই দু’বার ছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের আর কখনও তেওতায় আসা হয়নি। তবে তার বেশ কিছু লেখায় তেওতার কথা এসেছে। ১৯২৩ সালে কবি আবার কুমিল্লায় আসেন। অসহায় গিরিবালা দেবী এ সময় কন্যাকে কবি নজরুলের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হলেন। কিন্তু ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবারের কেউ এ বিয়েতে রাজি হলেন না। তখন গিরিবালা দেবী কুমিল্লা ছেড়ে ভাইয়ের কাছে বিহারের সমস্তিপুরে চলে যান। কুমিল্লা থেকে তারা কাজী নজরুল ইসলামের সাথে কলকাতায় অদুরের বালিগ্রাম অবধি যান। সেখানে থেকে বিহারের সমস্তিপুরে ভাইয়ের কাছে চলে যান।
হুগলির সরকারি উকিল খান বাহাদুর মাযহারুল আনোয়ার চৌধুরীর কন্যা হচ্ছেন মাসুদা খাতুন (১৮৮৫-১৯২৬) যিনি কাজী মাহমুদুর রহমানের সাথে বিয়ের পর পরিচিতা হন মিসেস এম রহমান নামে। মিসেস এম রহমানকে কাজী নজরুল ইসলাম মা বলে ডাকতেন। এই মিসেস এম রহমানের সহযোগীতায় ১৯২৪ সালে ২০ই এপ্রিল শুক্রবার বাদ জুমা তড়িঘড়ি করে ৬নং হাজী লেনের কবির ভাড়া বাসায় প্রমীলার সাথে বিয়ে পড়ানো হয়। হুগলি থেকে বাসা বদল করে পরে সপরিবারে চলে আনে কৃষ্ণনগরে।
আলী আকবর খান পরে দৌলকপুর থেকে নার্গিসকে ১৯২৫ সালে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তখন তিনি বাংলাবাজারে পাঠ্যপুস্তক ব্যবসা ও বইয়ের দোকান চালু করেছেন। ব্যবসার ম্যানেজার ছিলেন করি আজিজুল হাকিম। নার্গিসকে ঢাকায় এনে তার বাসায় রেখে আলী আকবর খান প্রাইভেট ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ান। মেধাবী নার্গিস পরে ইডেন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। তিনি সাহিত্য সাধনা করেন। তহমিনা, ধুমকেতু, পথিক হাওয়া ইত্যাদি তার রচিত উপন্যাস। ঢাকা কলেজ থেকে বিএ পাস করা চিরকুমার আলী আকবর খানের ম্যানেজার ঢাকার নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদের সন্তান কবি নজরুলের ¯েœহের আজিজূল হাকিমের (১৯০৮-৬২) সাথে ১৯৩৮ সালে নার্গিসের বিয়ে দেওয়া হয়। তার আগে আলী আকবর খানের বন্ধু ময়মনসিংহের অধ্যাপক হেলালুদ্দিনের সহযোগিতায় ১৯৩৭ সালের ৪ঠা নভেম্মর নার্গিসকে নিয়ে তার মামাত ভাই ওয়াজেদ আলী খান ও নোয়াজেস মোহাম্মদ খান (টুকু খান) কলকাতায় গিয়ে শিয়ালদহ হোটেলে বসে তালাকনামায় কবি নজরুল ইসলামের সই নেন।
নার্গিস ও কবি আজিজুল হাকিম দম্পতির সন্তানেরা হলেন ডা. ফিরোজ আজাদ ও অধ্যাপিকা শাহানারা খানম। ছেলেমেয়েরা সকলেই ছিলেন লন্ডন প্রবাসী। ১৯৬২ সালে কবি আজিজূল হাকিমের মৃত্যুর পর নার্গিস ছেলের কাছে লন্ডন চলে যান। নার্গিস (১৯০৪-৮৫) তার ছেলের কাছে থাকা অবস্থায় ১৯৮৫ সালে ম্যানচেস্টারে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তিনি সমাহিত হন।
১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাতে প্রমীলার শরীরের নিচের অংশ অচল হয়ে গেলেও ওপরের অংশ সচল ছিল। শুয়ে শুয়ে পূজা, স্বামীর সেবাসহ বাসায় সব কাজ তিনি করতে পারতেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গার সময় গিরিবালা দেবী নীরবে নিরুদ্দিষ্টা হয়ে গেলেন। ১৯৬২ সালের ৩০শে জুন প্রমীলা কলকাতায় মারা যান।
কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ ভেবেছিলেন প্রমীলার দেহ বৈদ্যুতিক চুল্লিতে দাহ করা হবে। কিন্তু প্রমীলার বাসনা জানার পর এবং কবির ভাইপোদের ইচ্ছায় তাকে চুরুলিয়ায় নিয়ে সমাহিত করা হয়। প্রমীলার জীবিতাবস্থায় চুরুলিয়ার কোনো আত্মীয়ের কোনো দিনই ঠাঁই হয়নি কাজী নজরুল ইসলামের কলকাতার বাসায়। তারপরও ভাইপোদের ধারনা ছিল পরে কবিকেও সেখানে সমাহিত করা গেলে চুরুলিয়ার কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঢাকায় মৃত্যুর পর তার রচিত গানের আকুতিকে মর্যাদা দিয়ে তাকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হ্রয়। তেওতার মেয়ে প্রমীলা চুরুলিয়ার, দৌলতপুরের নার্গিস সুদূর ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে আর কাজী নজরুল ইসলাম চুরুলিয়ার পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে সমাহিত হন। এসবই হলো নিয়তি।
0 Comments