ভুবনঘরের মৌলভী আবদুল সোবহান ও ভুবনঘর মিয়াবাড়ি

সাবেক ত্রিপুরার সমতল অঞ্চল বর্তমান বৃহত্তর কুমিল্লা এলাকার অনেক মানুষের কথা আমর ইতিহাস থেকে জানতে পারি- যারা নিজের জীবন নিজেই গড়ে তুলেছেন অর্থ্যাৎ বলতে গেলে তারা ছিলেন ‘সেলফ মেইড’ মানুষ। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর ইউনিয়নের ভুবনঘর মিয়াবাড়ির মৌলভী আবদুস সোবহান ওরফে আবদু মিয়া ছিলেন তেমনি একজন মানুষ।


            আবদু মিয়ার পরিবার ছিল অভিজাত অথচ সে সময়ে কম অবস্থাপন্ন। আবদু মিয়ার বাবা মুন্সি আজিমুদ্দিন নারায়ণগঞ্জ এলাকার এক ছোট জমিদারির জনৈকা বিধবা মুসলিম জমিদারের নায়েব ছিলেন। তিনি সেখানেই থাকতেন আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তার স্ত্রী ভূবনঘরের গ্রামে বাড়িতে থাকতেন। মুন্সি আজিমুদ্দিন নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়ি এসে তার স্ত্রীর কাছে সংসার চালানোর মতো কিছু টাকা পয়সা মাঝে মাঝে দিয়ে যেতেন। মুন্সি আজিমুদ্দিন একমাত্র পুত্র সন্তান আবদু মিয়া তখন কেবল শিশু।


            মুন্সি আজিমুদ্দিন সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে। গল্পটি সেই পরিবারের প্রবীণ এক সদস্যের কাছ থেকে জানা। মুন্সি আজিমুদ্দিন নাকি তার জমিদারের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে বিধবা মহিলা জমিদারের সাথে নায়েব সাহেবের বিয়ে হয়। নায়েব সাহেব বেশ কিছুদিন আর বাড়ির খোঁজখবর নিতে পারেননি। জমিদারপতœী তার নতুন স্বামী মুন্সি আজিমুদ্দিনকে নিয়ে নির্ভাবনায়ই ছিলেন। নায়েব সাহেব একদিন স্থির করলেন গ্রামের বাড়ি ভুবনঘরে আসবেন। তার জমিদার স্ত্রীও সাথে আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কী আর করা, নায়েব সাহেব রাজি হলেন। জমিদার স্ত্রীর ছিল বিরাট বজরা। সে বজরায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক চাকরবাকর, বরকন্দাজ, বাবুর্চি ইত্যাদি নিয়ে রওনা হয়ে মেঘনা তিতাস পেরিয়ে গোমতীর উজান বেয়ে একেবারে ভুবনঘরে পৌছে ঘা্েট বজরা ভেড়ান। ভুবনঘরগ্রামের উত্তরে গোমতীর ওপারেই মুরাদনগর থানা সদর। নায়েব সাহেব জমিদার স্ত্রীকে নৌকায় রেখে একলাই বাড়ি গেলেন। বাড়ি এসে শিশুপুত্র আবদু মিয়ার চাঁদবদন দেখে মায়ার আবদ্ধ হয়ে তার ভাবান্তর হয়। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে আসতে আর নৌকার কাছে গেলেন না। গ্রামের অনেকের অনুরোধ সত্তে¡ও তিনি আর বজরার কাছে যাননি। এই অমানবিক আচরণে এলাকার মানুষ হন হতবাক আর জমিদার স্ত্রী হন বিস্মিত। জমিদার স্ত্রীও বললেন যে নায়েব সাহেব না এলে তিনি তার বজরা থেকে নেমে বাড়িতে উঠবেননা। নায়েবসাহেবের দ্বিতীয় পতœী এভাবে কয়েক দিন গোমতী নদীতে নোঙর করা বজরায় কাটালেন। তারপরও মুন্সি আজিমুদ্দিন তার জমিদার স্ত্রীকে বজরা থেকে নিতে আসেননি। বেচারি কী আর করেন। অপমানে ও নায়েবের আচরণে ক্ষব্ধ হয়ে অবশেষে বজরার নোঙর তুলতে মাঝিকে আদেশ করেন। ফিরে গেলেন নিজের বাড়ি। আবদু মিয়ার বাবা জমিদার স্ত্রীর সাথে আর ফিরে গেলেন না।


            আবদু মিয়ার বাবা নায়েবগিরি হারিয়ে বাঁচার স্বার্থে ছোটখাটো ব্যবসায় নামেন। গোমতীতীরের স্থানীয় কোম্পানিঞ্জ বাজারে গিয়ে বন্ধুদের সা্েরথ মালপত্র কিনে এনে থানা সদর মুরাদনগর বাজার ও আশপাশের বাজারে বিক্রি করতেন। এতে সমান্য যা আয় হতো তা দিয়ে আর জমিজমার আয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছিলেন। একদিন বরাবরের মতো টাকাপয়সা নিয়ে দিনের প্রথম ভাগে ব্যবসায়িক বন্ধুদের সাথে বাড়ি থেকে রওনা হয়ে কোম্পানিগঞ্জ বাজারে গেলেন। বিকালে বন্ধুরা তার লাশ নিয়ে বাড়ি এসে জানায় যে ওলাউঠায় বাজারেই তিনি মারা গেছেন। সাথে নেওয়া টাকাপয়সার সন্ধান আর বন্ধুর তার স্ত্রীকে দিতে পারলেন না।


            মুন্সি আজিমুদ্দিনের মৃত্যু সময় আবদু মিয়া ছিলেন নাবালক। বাবা মারা যাওয়ার ফলে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা স্বভাবতই আরও পড়ে গিয়েছিল। তার বাবা যে পরিমান ভুসম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তা ছিল খুবই অপ্রতুল। আবদু মিয়ার মা তার মেয়েজামাইদের সাহায্যে সেগুলোতে চাষবাস, বাড়িতে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগী ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে যে আয় হতো তা দিয়ে সংসার চালাতেন। আবদু মিয়া একটু বড় হলে তার বাবার নারায়ণগঞ্জের বন্ধুরা খবর নিয়ে তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তারা তাকে নারায়ণগঞ্জ আলাকায় নিয়ে গেয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। বাবার বন্ধুদের সহায়তায় লজিং থেকে অনেক চেষ্টায় আবদু মিয়া ছাত্রবৃত্তি পাস করেন। তিনি বেশ মেধারী ছিলেন। ছাত্রবৃত্তি পাসের পর তিনি মোক্তারি পাস করেন। বাংলা ওকালতিও পাস করেছিলেন তিনি। বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানায় তখন মুন্সেফি আদালত ছিল। নবীনগর আদালতে তিনি ওকালতি আবম্ভ করেন।


            তিনি ছিলেন সুদর্শন, বুদ্ধিমান ও  বৈষয়িক জ্ঞানসম্পন্ন স্বল্পবাষী মানুষ। অধিকিন্তু তিনি ছিলেন সুপÐিত ও শ্রæতিধর। একবার কোনো ঘটনা অথবা কোনো মানুষের নাম জানলে অথবা ঘটনার সন তারিখ শুনলে আর ভুলতে না। মক্কেলদের প্রতিটি কথা এভাবে একবার শুনলে সেগুলো আর ভুলতেনা, মনে রাখতে পারতেন। নদীবিধৌত ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত নবীনগর এলাকার ফৌজদারি মামাল হতো প্রচুর। হাটে মাটে ঘাটে দেখা হয়ে জিজ্ঞাসিত হলে মক্কেলদের সঠিক তথ্য নিতে পারতেন। মামলা পরিচালনার কায়দা ও সফলতার মক্কেলরা ছিলেন তার প্রতি খুশি। সে কারণে অকিল হিসেবে তিনি খুব জনপ্রিয় ছিলেন।


            নবীনগর সদরে একটি বাড়ি নির্মান করে মুলিবাঁশের বাউন্ডারি দিয়ে সেখানে আবদু মিয়া সপরিবারে ব্যবসা আরম্ভ করেন। নবীনগর ওকালতিতে আর বেশ পসার হয়। নবীনগর স্থানীয় জনগনের মাঝেও তিনি খুব জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি ওকালতিতে প্রচুর উপর্জন করেন। আদালতে গেয়ে মক্কেলদের কাছ থেকে প্রাপ্ত টাকা দফায় দফায় নিয়ে এসে ঘরে তার স্ত্রীর কাছে দিতেন। তার স্ত্রী টাকা ঘরের সিন্দুকে রাখার জন্য সিন্দুক খুলতে এবং বন্ধ করতে করতে বিরক্ত হয়ে যেতেন। তিনি নবীনগরের সামাজিক নানা কাজে জড়িত ছিলেন। তিনি সেখানে অনেক জনহিতকর কাজও করেছেন।


            তার অর্জিত সে টাকা ধীরে ধীরে তিনি মুরাদনগর ভুবনঘরের বাড়িতে প্রাচীরবেষ্টিত মস্ত দোথলা বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে খনন করেন পুুকুর, নির্মাণ করেন শান বাঁধানো ঘ্ট্,া সৃজন করেন ফুলের বাগান, ফলের বাগান, কারুকাজ করা মসজিদ, মসজিদের শান বাঁধানো প্রশস্ত প্রাঙ্গন, মিনার, মসজিদের পাশে পাকা ঘাটসহ পুকুর তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করেন আবদু মিয়ার ঐতিহ্যবাহী এই মিয়াবাড়ি। মিয়াবড়ির উত্তর দিক দিয়ে বয়ে চলেছে পুবের পাহাড় থেকে নেমে আসা খর¯্রােতা গোমতী নদী। তিনি ধীরে ধীরে অনেক ভসম্পত্তি ক্রয় করেন। তিনি বরদাখাতের প্রখ্যাত জমিদার মীর আশরাফ আলী খানের (১৭৫৫-১৮২৯) জমিদারি এলাকার একটি জমিদারিে ক্রয় করেন। ভুবনঘর গ্রামে তার বাড়িটিই ছিল তখন একমাত্র পাকা বাড়ি। তার সেই বাড়িতে কর্মচারী, চৌকিদার, নায়েুব, রাখাল, ক্ষেতমজুর ইত্যাদি নিয়ে বাইরে যেমন ছিল অনেক লোকের সমাগম তেমনি বাড়ির আন্দরেও ছিল বৃতৎ সংসাররের রান্না ও অন্যান্য ঘরকন্নার জন্য অনেক মানুষ। মৌলভী আবদুস সোবহানের সংসারের ছেলেমেয়ে নাতিনাতনি নিয়ে দার মিয়াবাড়ি ছিল সরগরম। তিনি ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা করেছিলেন। তার মেয়েদের তিনি সুপাত্রে বিয়ে দেন। বিশাল পরিবারের তার ছেলেমেয়ে নাতিনাতনিরা সকলেই বছরে কমপক্ষে একবার হলেও (লম্বা ছুটিতে) কুমিল্লা, ঢাকাসহ নানা জায়গা থেকে এসে ভুবনঘরের মিয়বাড়িতে সমবেত হতো। অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহানের স্ত্রী সৈয়দা সৈয়দুন্নেসার ইচ্ছায় এটা যেন মিয়াবাড়ির রীতি হয়েই দাঁড়িয়াছিল। ১৯৬৯ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকায় ডেমরা ও কুমিল্লার মুরাদনগরের সদরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচÐ ঘূর্ণিঝড়ে এই মিয়াবাড়িরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।


            অ্যাডভোকেট মৌলভী আবদুস সোবহান মুরাদনগর উপজেলার কামাল্লার চৌধুরীবাড়িতে প্রথমে বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষে স্ত্রীর গর্ভে তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র চান মিয়া ও এক কন্যা আগেই মারা যায়। এক ছেলে আবদুল হামিদকে (মানু মিয়া) রেশে কামাল্লায় চৌধুরী বাড়ির স্ত্রীও পরলোকগমন করেন। আবদুল হামিদ চাকরি জীবনে জেলা রেজিস্ট্রার হয়েছিলেন। পরে তিনি অনাবারি ম্যাজিস্ট্রট পদেও দায়িত্ব পালন করেন। আবদুল হামিদের প্রথম স্ত্রী ছিলেন কুমিল্লা শহরের মুন্সেফবাড়ির মেয়ে। প্রথম স্ত্রী গর্ভজাত দুই ছেলে ছিলেন আবদুর রশীদ (তারা মিয়া) ও হারুনুর রশীদ (খুশু মিয়া) প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর সময় খুশু মিয়া ছিলেন শিশু। আবদুল হামিদের প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি আবার বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত দুই ছেলে হলেন আবদুল কাদের (কবীর) ও জিন্নাহ। ছেলেদের সকলেই ছিলেন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। অ্যাডভোকেট হারুনুর রশীদ বিএল কুমিল্লা আদালতে ওকালতি করতেন। তাঁর কুমিল্লা শহরের বাসা ছিল ছোটরায়। তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। অ্যাডভোকেট হারুনুর রশীদ পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত দেশে প্রথম নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বচিত হয়েছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক সরকারের পার্লামেন্টারি পার্টির সেক্রেটারি নিযুক্ত হয়েছিলেন।


            নবীনগরের শ্রীরামপুরে কৃতী সন্তান, ভাষাসৈনিক, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ শাজাহান চৌধুরী ও রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যাপক মুরাদনগরের ভূতাইল গ্রামের কৃতী সন্তার আবু তাহের (১৯৩৭-৯৭) বন্ধ হয়ে থাকা শ্রীকাইল কলেজ পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রথম উদ্যোগ নিয়ে সোনাকান্দার পীরসাহেবের সহায়তা কামনা করেন। অধ্যক্ষ শাহজাহান চৌধুরী  ও অধ্যাপক আবু তাহেরের উদ্যোগে ১৯৬৩ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে শ্রীকাইল কলেজ পুনরায় চালু করার সময় সোনাকান্দার পীরসাহেব হজরত মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর (১৯০০-১৯৬৪) মুরিদ পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী অ্যাডভোকেট মফিজ উদ্দিন আহমদকে (১৮৯৮-১৯৭৯) দিয়ে কলেজ উদ্বোধন করানোর ক্ষেত্রে অ্যডভোকেট হারুনুর রশীদ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ১৯৬৫ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।


            অ্যাডভোকেট হারুনুর রশীদ ও নুরজাহান রশীদ দম্পতির ছেলে ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন (জন্ম ১৯৪৭) ছাত্রজীবনে প্রথম মেধায় পরিচয় দিয়েছেন। তিনি একজন এফসিএ, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, বিশিষ্ট শিল্পপতি, নিঃস্বার্থ সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী। ইউসুফ আবদুল্লাহ হরুন এফসিএ ও সাবেরা পারভীন (প্রয়াত) দম্পতির দুই ছেলে, তারা উভয়েই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন পুনরায় বিয়ে করেছেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানও রয়েছে।


            বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বৃহত্তম সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অথ্যাৎ এফবিসিসিআইয়ের তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন একাধিকবার। তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আওয়ামী নীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুরাদনগর (কুমিল্লা-৩) থেকে কৌশলগত কারণে নির্দলীয় প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রপিতামহ মৌলভী আবদুস সোবহানের মতো ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনও একজন ধার্শিক, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী হিসেবে সুপরিচিত। মৌলভী আবদুস সোবহান কর্তৃক ১৮৯৬ সালে তার কর্মস্থলে নবীনগর হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার শতবছর পরে ১৯৯৬ সালে তার সুযোগ্য উত্তরসুরি (প্রপৌত্র) ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন (নাসিম) মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর ইউনিয়নের কুড়েরপাড় গ্রামের শিক্ষানুরাগীদের দান করা জমির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করেন কুড়েরপাড় আদর্শ মহিলা কলেজ। ২০০১ সালে সহশিক্ষা, ২০০২ সালে ডিগ্রি কোর্স এবং ২০১৩ সালে অনার্স কোর্স চালুর পর এখন কুড়েরপাড় আদর্শ বিশ^বিদ্যালয় কলেজ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার প্রতিষ্ঠিত কোড়েরপাড় আদর্শ বিশ^বিদ্যালয় কলেজেই উপজেলার এলাকার মধ্যে প্রথম অনার্স কোর্স চালু করা হয়। কোড়েরপাড় আদর্শ বিশ^বিদ্যালয় কলেজ অনার্স কোর্স চালু করার মাধ্যমে এলাকার ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষা লাভের পথ সগম হয়। মুরাদনগরের শ্রীকাইল গ্রামের দত্ত পরিবারের কৃতী সন্তান দানবীর ক্যাপ্টেন ডাক্তার নরেন্দ্রনাী দত্ত ৯১৮৮৪-১৯৪৯) কর্তৃক ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীকাইল কলেজ ২০১৬ সালে যখন সরকারিকরণ করা হয় তখন এলাকার এমপি হিসেবে ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন এফসিএ আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার সাথে সেই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন। শ্রীকাইল কলেজ সরকারিকরণের আনন্দে ২০১৬ সালে ৫ই নভেম্বর কলেজ ময়দানে আয়োজিত উৎসব সভায় কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মুরাদনগরের এমপি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের আমন্ত্রনে বাংলাদেশ সরকারের রেলমন্ত্রী মোহাম্মদ মুজিবুল হক যোগদান করেছিলেন।


            অ্যাডভোকেট মৌলভী আবদুর সোনাহানের কুমিল্লা চৌধুরীবাড়ির স্ত্রীর মৃত্যর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দবাড়ির পীরসাহেব মী ফরাসত আলীর জ্যেষ্ঠা কন্যা সৈয়দা ৗসয়দুন্নেসার সাথে তার আবার বিয়ে হয়। সৈয়দা সৈয়দুন্নেসা অল্প বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন। তিনি তার বাবার কাছে বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারসির প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আজীবন জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। সৈয়দা সৈয়দুন্নেসা সমীহ জাগানিঢ ব্যাক্তিত্বের অধিকারিনী ছিলেন। তিনি যখন যেখানে থাকতেন সেখানেই প্রধান ব্যাক্তি হয়ে থাকতেন। সমীহ জাগানোর মতো ব্যাক্তিত্বের জন্য তাকে সকলেই য়থেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। তার ছিল অসংখ্যা নাতি-নাতনি। তারা যখন ছুটিতে তার বাড়িতে বেড়াতে আসত তখন তিনি তাদের সাথে থাকা বিভিন্ন শ্রেনির পাঠ্যপুস্তকগুলো পড়তেন। ধর্মীয় বইসহ নানা ধরনের বই পাঠ করে এভাবে তিনি তাঁর জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে নিজে আরও সমৃদ্ধ হয়েছেন।


            সৈয়দা সৈয়দুন্নেসার গর্ভে আট সন্তান জন্মলাভ করে। তাদের মধ্যে পাঁচ ময়ে ও তিন ছেলে। মেয়েরা হলেন-১, মাহবুবা খাতুন, স্বামী জমিদার পরিবারের সন্তান রিয়াজ উদ্দিন ওরফে সোনা মিয়া (সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার), দারোগা বাড়ি, কুমিল্লা (এই দম্পতির সন্তান সোহেলা, আজাদ, ডা. আবাদ ও আহাদ); ২. মাসুমা বেগম, স্বামী ডেপুিিট ম্যাজি্েস্ট্রট আবদুল হালিম চৌধুরী, চাটখিলা, নোয়াখালী (প্রথম সন্তান জন্মের সময়ই মাসুমা বেগম মারা যান); ৩. আসিয় বেগম, স্বামী সুপারিনটেনডেন্ট অব এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, অষ্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ( এই দম্পতির সন্তান সুফিয়া খাতুন, শফিকুল ইসলাম চুনী, বদরুন্নেসা পরি, ড. রফিকুল ইসলাম মতি, রওশন আরা খান বুড়ি, ময়িনুল ইসলাম জিলু, মাহবুবুল ইসলাম মবু, ফজিতুন্নেসা কচি, আবু ইসমাইল খালেদ, কামরুন্নেসা রীনা ও আবু ইসহাক সেলিম); ৪. আফিয়া বেগম, স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রট আবদুল হালিম চৌধুরী, চাটখিলা, নোয়াখালী ( এই দম্পতির সন্তান কবীর চৌধুরী মানিক, মুনীর চৌধুরী, নাদেরা বেগম হেনা, নাসির চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, রওশন আরা কণা, মঞ্জুর এলাহী, ুদলারা বেগম দিলু, ড. ইকবাল শেলী, শমসের আজাদ রুশদি, ফেরদৌসী মজুমদার, আতাব বানু, মাহবুব এলাহি ও রাহেলা বানু); ৫. ফাহিমা বেগম, স্বামী কর কমিশনার পীরসাহেব আবদুল আজিজ, কুড়েরপাড়, মুরাদনগর, কুমিল্লা ( এই দম্পতির সন্তান গোলাম কিবরিয়া সুরুয, ডা. আবদুল মোকাদ্দেম বাহার, আবদুল মুকতাদির নাহার, সামসুদ্দোহা ফারুক, আবদল হালিম খোকা, মমতাজ বেগম মমতা, আমেন বেগম লিলি, আবদুর রহিম, ড. মালেকা বেগম, আবদুল কাইয়ুম মুকুল, আবদুর রহমান বকুল, ড. আহমেদ আবদুল্লাহ জামাল)। আর ছেলেরা হলেন-১, আবু মুসা মোহাম্মদ মোজতবা, (সন্তান : বিচাপতি একেএম সাদেক, প্রকৌশলী এবিএম সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট এএনএম সফিক, প্রকৌশলী রফিক মোজতবা, আতিক মোজতবা, তৌফিক মোজতবা, সালেহা, সাজেদা বেগম রুনু, শরিফা বেগম শিরিন); ২. আবু ঈসা আহমদ মসিহ ( সন্তান : ডা. আবু তাহের, আবু আইজিপি আবদুর রহিম, উম্মে কুলসুম শাহজাদী, স্বামী বিচারপতি একেএম সাদেক, লুৎফুন্নেসা, স্বামী জেল জজ মাহবুব হোসেন, নাজমা আকতার নাজনি); ৩. বাচ্চু মিয়া (অকালপ্রয়াত)।


            নোয়াখালির চাটখিলের গোপাইরবাগের মুন্সি আবদুস সোবহান ও আফতাব বানু দম্পতির কৃর্তী সন্তান আবদুল হালিম চৌধুরী মাদ্রাসার পড়া শেষ করে আলীগড় বিশ^বিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভের পর হয়েছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর নিকট ভুবনঘরের মৌলবী আবদুল সোবহানের মেয়ে মাসুমা বেগমকে বিয়ে দেওয়ার পর প্রথম সন্তান জন্মের সময় মাসুমা মারা যান। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরীকে জামাতা হিসেবে ধরে রাখার জন্য অ্যাডভোকেট আবদুল সোবহান তাঁর চতুর্থ মেয়ে আফিয়া বেগমকে বিয়ে দিতে আগ্রহী হলেন। কিন্তু তার স্ত্রী সৈয়দা সৈয়দুন্নেসা গোঁ ধরলেন মেয়েকে এক প্রস্ত নতুন গয়না দিতে হবে। এক প্রস্ত নতুন গয়না দেওয়ার সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই আবদুল হালিম চৌধুরীর ছিল না। তখন অ্যাডভোকেট মৌলবী আবদুস সোবহান গোপনে আবদুল হালিম চৌুধুরীর হাতে নতুন গয়না তৈরির জন্য ৫০০ টাকা দেন। আর এটাও বলে দেন তার শাশুড়ি যেন তা জানতে না পারেন। বিয়ে হওয়ার অনেক পরে টাকার বিষয়টি জানাজানি হয়েছিল।


            ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরী চাকরি থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময়ে তার ১৪ সন্তানের মধ্যে কেবল জ্যেষ্ঠ পুত্র কবীর চৌধুরী জেলা ফুড কন্ট্রোলার পদে টাঙ্গাইল জেলায় চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। সে সময়ে কবীর চৌধুরী ছিলেন বিবাহিত। তার স্ত্রী ছিলেন খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও পানি বিশেষজ্ঞ, দিনাজপুরের বিএম আব্বাস এটির বোন মেহের কবীর মেরি। হেহের কবীর মেরি রসায়নে এমএসসি (পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা করেছিলেন)। কবীর চৌধুরীর ভাইবোনদের বাকিরা সবাই তখনও ছাত্র। তখন ঢাকা শহরের বাইরে একেবারে কাঁচা রাস্তার গ্রাম্য পরিবেশের একটি বাড়ি কিনে সেটি স্ত্রীর নামে নামকরণ করেন ‘দারুল আফিয়া’ । এটিই তাদের ধানমন্ডির বর্তমান সেন্ট্রাল রোডের ২০ নম্বর বাড়ি। দারুল আফিয়ার কাছাকাছি আরো কয়েক বিঘা জমি আবদুল হালিম চৌধুরী বিনেছিলেন। এসব জমির মালিক ছিল বেশিরভাগ হিন্দু। তারা জমি বিক্রি করে ভারতে পারি জমিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সালে আবদুল হালিম চৌধুরী তার বাড়ির পাশে টিনের কয়েকটি ঘর ও ফলদ গাছসহ সেন্ট্রাল রোডে আরেকটি বড় আয়তনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্ট গ্রামের তার ভায়রা ভাই মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে ধার হিবেবে দেওয়া আড়াই হাজার টাকায় কিনে দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বাড়িতে থাকা গাছের ফলফলাদিবিক্রি করেই ধীরে ধীরে আবদুল হালিম চৌধুরীর পক্ষে সে ধারের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছিল। ভায়রা ভাই মোহাম্মদ আবদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস স্কুলের (১৯৭১ সালের আগে ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট মর্ডান স্কুল) শিক্ষিকা সুুফিয়া খাতুনকেও (সুফিয়া খাতুন ছিলেন আবদুল হালিম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ ভাই মোহাম্মদ ওয়াসেকের একমাত্র ছেলে একে এম ওয়াজিদ উল্লাহর স্ত্রী। তিনি সেন্ট্রাল রোডে একটি বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে থেকে সুফিয়া খাতুন সেই বাসায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেন্ট্রাল রোডের সেই বাড়ি থেকে মাটির কাঁচা রাস্তা ধরে পুবদিকে হেঁটে হাতিরপুর অতিক্রম করে পরীভাগের কাছে এসে প্রধান সড়কে উঠে নানামুখী যাতায়াত তখন সহজ ছিল। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যাড, আবদূুল হালিম চৌধুরীর ভায়রা ভাই কিশোরগঞ্জের মোহাম্মদ আবদুল্লাহর চাকরি-পরবর্তীকালে ১৯৪৭ সালে অষ্টগ্রাম গিয়ে শখের বশে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হওয়ার কারণে বিপদে পড়ার ঘটনা। তিনি ভেবেছিলেন দেশে গিয়ে উন্নয়ন ও সমাজকল্যায়নমূলক কাজের মাধ্যমে এলাকার মানুষের সেবা করবেন। কিন্তু নিজের পরিবার চালনা, প্রেসিডেন্টশিপ পরিচালনা আর সমাজসেবাসহ নানা কাজে জড়িয়ে তিনি বড় ধরনের ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সে ঋন থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তার কেনা ঢাকায় সেগুনবাগিচার দেড় বিঘা জমি  (যেখানে এখন চট্রগ্রাম আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে) এবং কুমিল্লা শহরের জজ কোর্টের উত্তরে ছোটরায় তার কিনা এক বিঘা জমির উপর বাড়িটি (মোহাম্মদ আবদুল্লাহর কুমিল্লা শহরের ছোছরার বাড়ির দক্ষিণে ছিল আবদু মিয়ার মেজ ছেলে আবু মুসা মোহাম্মদ মোজতবার বাড়ি ‘দ্য ক্রিসেন্ট হল’ যার পাশেই ছিল তার ছোট ভাই আবু ঈসা আহমদ মসিহর বাড়ি) বিক্রি করে ঋন থেকে কোনো প্রকারে মুক্তি লাভ করেন। ভাগ্য ভালো ছিল যে, তার সেন্ট্রাল রোডের বাড়িটি বেহাত হওয়া থেকে সেই যাত্রা রক্ষা পায়। মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাঁর শেষজীবন ঢাকার সেন্ট্রাল রোডের সেই বাসায় অতিবাহিত করেন।


            অ্যাডভোকেট মৌলবী আবদুস সোবহান ১৮৯৬ সালে নবীনগর সদরে যে নবীনগর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন যোগেশচন্দ্র গুপ্ত (১৯২০-৪৫)। নবীনগর সদরে তার প্রতিষ্ঠিত নবীনগর মডেল পাইলট হাই স্কুল ইতোমধ্যে সরকারিকরণ হয়েছে। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া শিখে জীবন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। অনেক কৃতি ছাত্রের মধ্যে প্রথম দিকের, ১৯০৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করা, ভাষাসৈনিক, কংগ্রেস নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বস্থ্যমন্ত্রী (১৯৫৭-৫৮) ব্রহ্মণবাড়িয়া শহরতলির রামরাইল গ্রামের কৃর্তী সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন অন্যতম।


            আবদু মিয়ার ছেলে-মেয়ে আর নাতি-নাতনিদের সংখ্যা যেমন ছিল অনেক, তাদের নিয়ে হাস্যকৌতুক আর সুখ-দুঃখের ঘটনা থাকারও কথা স্বভাবতই বেশী। তাদের বিষয়ে এখানে কিছু ঘঠন্রা কথা উল্লেখ করা হলো।


            আফিয়া বেগমের বড় ছেলে কবীর চৌধুরী মানিক তখন কলেজের ছাত্র। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল হালিম চৌধুরী সপরিবারে ভূবনঘরে বেড়াতে এসেছেন। এদিকে মানিকের ছিল বই পড়ার প্রবল নেশা। মুনির ভুবনঘরে এলে হাতে শুলতি নিয়ে বাগানে পাখির খোঁজে বের হতো। মানিককে তার মা বই ছেড়ে বাইরে ঘুরে আসার জন্য তাগিত দেন। মানিক বই ছেড়ে অন্যদের সাথে বাগানের দিকে চলে যায়। কিছুক্ষন পর মানিককে আর অন্যদের সাথে পাওয়া যায় না। অনেক খোঁজাখোঁজির পর দেখা গেল মিয়াবাড়ির বাইরের ঘরের একটি চৌকির ওপর রাখা লেপ-তোশকের নিচে টর্চ হাতে মানিক আত্মগোপন করে ওখানে বই পড়ছে। এই বই পড়ার মানিক ছেলেটিই ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের  অধ্যাপক শহীদ মুনীর চৌধুরী জ্যেষ্ঠ ভাই খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী (১৯২৩-২০১১)।


            বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকালে এই পরিবারের একটি ঘটনা আছে, যা খুবই শোকাবহ। মৌলভী আবদুস সোবাহানের দ্বিতীয় পক্ষের জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যাডভোকেট আবু মুসা মোহাম্মদ মোজতবার জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন বিচারপতি একেএম সাদেক। তিনি পরে হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। হঠাৎ একদিন ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন যায় তার কাছে যে তার ভগ্নিপতি কর্নেল মোস্তাক আহমেদ আত্মহত্যা করেছেন। তার মৃতদেহ যেন তারা ক্যান্টনমেন্ট এসে দেখে যান। একেএম সাদেকের কনিষ্ঠ বোন শরিফা বেগম শিরিনের স্বামী ছিলেন কর্নেল মোস্তাক আহমেদ। কর্নেল মোস্তাক আহমেদের পোস্টিং ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকে তাকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বদলি করা হয় চট্রগ্রামে। যশোর থেকে সপরিবারে এসে তিনি একেএম সাদেকের বাসায় ওঠেন ( সে সময়ে একেএম সাদেক জজ ছিলেন, বিচারপতি হয়েছিলেন পরে)। চট্রাগ্রামে তখন স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। তাকে চট্রগ্রাম না পাঠিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এক বাহিনীর সিও (কমান্ডিং অফিসার) করে রাখা হয়। তিনি ক্যান্টনমেন্ট বাসা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। পরিবার নিয়ে বাসায় ্উঠে যান তিনি। কর্নেল মোস্তাকের আত্মহত্যার খবর পেয়ে শোকতুর একেএম সাদেক স্ত্রী শাহজাদী ( শাহজাদী ছিলেন তার কাকা আবু ঈসা আহমদ মসিহর কন্যা), শ্যালিকা সেতারাসহ পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে যান এবং বোনজামাইর মৃতদেহ একটি টেবিলের ওপর শায়িত দেখতে পান। লাশ তাদের কাছে হস্থান্তর করা হয়নি। আর্মির তত্ত¡াবধানে কর্নেল মোস্তাক আহমেদের লাশ আর্মি সিমেট্রিতে দাফন করা হবে বলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দুই সন্তানসহ শিরিনকে তার বাসায় নিয়ে আসেন। পরে প্রকৃত ঘটনা যা জানা গেছে তাতে দেখা যায়, কর্নেল মোস্তাককে যে ইউনিটে সিও করা হয়েছিল সেই ইউনিটেরই এক পাঞ্জারি ক্যাপ্টেন মোস্তাকের পিস্তল দিয়েই তাকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছিল। এই দুঃখজনক ঘটনার পর তার স্ত্রী শরিফ বেগম শিরিন দুটি শিশুসন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করার মাধ্যমে সন্তান দুটি মাসুষ করার চেষ্টা করেন। লেখাপড়া করিয়ে সন্তানদের আমেরিকায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একাত্তরে ঘটে যাওয়া শোকবহ স্মৃতি ভোলার চেষ্টা করেছিলেন।


            অ্যাডভোকেট মৌলভী আবদুস সোবহানের কনিষ্ঠা মেয়ে কুড়েরপাড়ের আবদুল আজিজের (১৯০০-১৯৬৯) স্ত্রী ফাহিমা বেগম (১৯১২-১৯৯৫) নানা রোগ ভোগের কারণে তখন দর্বল হয়ে সবসময় বিমর্ষভাবে থাকতেন। তখন তার বয়স হয়েছিল আশি বছর। তিনি থাকতেন ঢাকার ওয়ারীর ১৫ নং লারমিনি স্ট্রিটের আজিজ মঞ্জিল ভবনে ছেলে আবদুল রহিমের সাথে। আবদুল আজিজ ও ফাহিমা বেগম দম্পতির নয় ছেলে ও তিন মেয়ের বিরাট সংসারের অনেকে ঢাকার নানা স্থানে বাসা নিয়ে থাকেন”। ডা. আবদুল মোকাদ্দেম বাহার (ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. এম এম আকাশের বাবা), শিল্পী আবদুল মুকতাদির নাহার (ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, সাংবাদিক ও লেখিকা কুররাতুল আইন তাহমিনা মিতির বাবা), ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামসুদ্দোহা ফারুক (ডা. তিবুন্নেছা ফ াতেমা খাতুন লিপি ও ড. সুমন দোহার বাবা), ড. মালেকা বেগম (স্বামী সাংবাদিক মতিউর রহমান) প্রমুখ ওয়ারীর আজিজ মঞ্জিলে বাইরে বিভিন্ন স্থানে বাসা নিয়ে আছেন। সাবেক অর্থ সচিব গোলাম কিবরিয়া, আবদুর রহিম, প্রথম আলোর সাংবাদিক আবদূল কাইয়ুর মুকুল, অধ্যাপক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ জামাল, অধ্যাপক আবদুল হালিম খোকা, আবদুর রহমান বকুল, মমতাজ বেগমসহ (স্বামী বাংলাদেশ সরকারের আমদানি-রফতানি অধিদপ্তরের সাবেক চিফ কন্ট্রোলার কুমিল্লার ব্রহ্মণপাড়ার মুজিবুর রহমান) আরও কয়েকজন পরিবার নিয়ে বহুতল ভবন আজিজ মঞ্জিলের বাসাগুলোতে থাকেন। ফাহিমা বেগমের কনিষ্ঠা মেয়ে নারীনেত্রী ও লেখিকা অধ্যাপক ড. মালেকা বেগম ভাবলেন তার মাকে তার বাল্যের স্মৃতিজিড়িত ভুবনঘরে ঘুরিয়ে আনতে পারলে হয়তো মায়ের ভালো লাকতে পারে, বিমর্ষ ভাব কেটে যেতে পারে। যে ভাবা সেই কাজ। মায়ের বাল্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ভুবনঘরে যাওয়ার প্রোগ্রাম করে ফেললেন। সহযাত্রী হলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের তার খালাতো বোন সুফিয়া খাতুন (শিক্ষাবিদ ও জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে আত্মজীবনির গ্রন্থের লেখিকা), ড. মালেকা বেগমের ছেলে সাশা, ভাই আবদুর রহিমের মেরঢ সাংবাদিক তাজনীন সুলতানা ইরা, ইরার মা অর্থাৎ আবদুর রহিমের স্ত্রী মন্নুজান বেগম (যিনি বৃদ্ধাবস্থায় ফাহিমা বেগমের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেখাশোনা ও সেবাযতœ করেছেন), ভুবনঘরের ছোট মামা আবু ঈসা আহমদ মসিহর ছেলে আবু সাঈদ মোহাম্মদ চিনুর স্ত্রী আকতার আর ড. মালেকা বেগমের শাশুড়ি লুঃফুন্নেছা বেগম (১৯২৭ সালের নির্বাচনে ঢাকার কাপাসিয়া এলাকার এমএলএ মৌলভী আবদুস সাহিদ মোক্তারেরর কন্যা ও প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের মা)। ১৯৯২ সালের ৫ই মার্চ সকাল ৮টার দিকে ওয়ারীর আজিজ মঞ্জিলের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে সবাইকে তুলে ড. মালেকা বেগম  মায়ের বিনোদনের জন্য মুরাদনগরের ভুবনঘরের মিয়বাড়ির উদ্দেশে রওয়া হলেন। চৈত্রের খরতাপে দগ্ধ হতে হতে তারা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পৌছে গেলেন ভুবনঘরে। ড. মালেকা বেগমের ছোটমামা আবু ঈসা আহমদ মসিহর ছেলে আবু সাঈদ মোহাম্মদ চিনু মিয়াবাড়িতে তখন থাকেন। তিনিই সবাইকে অভ্যর্থনা করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন। মিয়াবাড়ির পুকুর থেকে সদ্য তোলা মাছে সবাইকে আপ্যায়ন করা হলো। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে সবাই দেখলেন। কিন্তু ফাহিমা বেগম বিছানা থেকে উঠে বাল্যের স্মৃতিময় বাড়িঘর ঘুরেফিরে দেখতে না পারলেও বোঝা গেল এখানে আজ শত কষ্টে আসতে পেরে তিনিও খুশি হয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৩টায়  আবার যাত্রা করলেন সবাই ভুবনঘর ছেড়ে কুমিল্লার উ্েদ্দশে। কুমিল্লায় উঠলেন গিয়ে জজকোর্টের কাছে ছোটরায় ড. মালেকা বেগমের মেজমামা আবু সুসা মোহাম্মদ মোজতবার ছেলে অ্যাডভোকেট আ ন ম সফিকের বাসায়। সবার সাথে সুখ-দুঃখের কথা বলে ও স্মৃতিচারণ করে সেদিন তারা চমৎকার সময় কাটালেন কুমিল্লায়। মানুষের জীবনে যখন দশদিক অন্ধকার করে দুঃখ নেমে আসে তখনও দখিনা মলয়ের মতো দুয়েকটা আশা জাগানিয়া ঘটনাও ঘটতেপারে। মানুষের জীবনযাত্রা হয়তো এক করণেই সহনীয় হয়ে থাকে। ¦ইে কষ্টকর একটি ভ্রমণে ফহিমা বেগমের বিমর্ষ ভাব পরিপূর্ণভাবে না কাটলেও ড. মালেকা বেগমের ভুবনঘর মিয়বাড়ি আসার স্মৃতি ফাহিমা বেগমকে সেদিন হয়তো খানিকটা স্বস্তি দিয়েছিল এবং প্রাণিতও করেছিল। ভুবনঘরে বেড়িয়ে যাওয়ার বছর তিনেক পর ১৯৯৫ সালে ফাহিমা বেগম ঢাকায় পরলোকগমন করেন।


            মৌলভী আবদুস সোবহানের ছোটছেলে আবু ঈসা আহমদ মসিহ কলকাতার পাতিপুকুরের জনৈক ফকিরের কাছে ঘন ঘন যাতায়াত করতে করতে ইসলাম ধর্মের প্রতি বেশি বেশি আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেন। ১৯২৮ সালে মৌলভী আবদুস সোবহান, তার স্ত্রী সৈয়দা সৈয়দুন্নেছা ও ছোট ছেলে আবু ঈসা আহমদ মসিহ সমুদ্রপথে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন। আবু ঈসা আহমদ মসিহ ফুরফুরা শরিফের পীর হজরত আবুবকর সিদ্দিকীর (র) মুরিদ হন। আবু ঈসা আহমদ মসিহর তাগিদের ফলে মৌলভী আবদুস সোবহানের পরিবারের প্রায় সকল পুরুষ সদস্যই ফুরফুরা শরিফের পীর হজরত আবুবকর সিদ্দিক (র) মুরিদ হয়েছিলেন। ইসলামের রীতিনীতি মিয়াবাড়িতে এ যাবৎ একটু ঢিলেঢালাভাবে পালিত হ”েয় আসছিল; তার পরিবর্তন ঘটতে থাকল। মেয়েদের মধ্যে পর্দাপ্রথার কঠোরতা দেখা গেল। আবু ঈসা আহমদ মসিহর নির্দেশ অনুসারে ইবাদত-বন্দেগি যেমন বেড়ে গেল, তেমনি বেড়ে গেল আচার-ব্যবহারের কঠোরতাও। কুড়েরপাড়ের মন্সি আনোয়ার উদ্দিন ও শুলবদন্নেছা দম্পতির বড় ছেলে ও মৌলভী আবদুস সোবহান আবদু মিয়ার কনিষ্ঠ জামাতা আবদুল আজিজ (১৯০০-১৯৬৯) ফুরফুরা শরিফের পীর হজরত আবুবকর সিদ্দিকীল (১৮৫৮-১৯৩৯) মুরিদ হয়েছিলেন এবং তার খেলাফত লাভ করেছিলেন।


            অ্যাডভোকেট মৌলভী আবদুস সোবহান ১৯৩৮ সালে মারা যান।


Post a Comment

0 Comments