সোনাকান্দার হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী

 

            কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরের সোনাকান্দার পীরসাহেব হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর (১৯০০-১৯৬৪) পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের আধিবাসী। তারা ছিলেন যোদ্ধা ও বিজয়ী। আর সে কারণে তাদের বংশগত উপাধি হয়ে দাঁড়ায় গাজী। পূর্ব পাঞ্জাব থেকে হিজরত করে আসতে আসতে পরিবারের কয়েকজন একপর্যায়ে বর্তমান কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর ইউনিয়নের গাজীজুর গ্রামে এস স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। তাদের বংশগত উপাধি গাজী থেকেই বসতি স্থাপনকৃত জনপদটিও পরে গাজীপুর নামে পরিচিতি পায়।


            পীরসাহেব হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর পূর্বপুরুষগণ বংশপরস্পরায় গাজীপুরে বসবাস করে আসছেন। তাদের বংশ বহু হাক্কানী আলেম ও বুজুর্গ লোক জন্মগ্রহন করেন। পীরসাহেবের তিন জন দাদার মধ্যে আপন দাদা শাহ্ সুফি গাজী আলী গাজীপুর গ্রাম থেকে সোনাকান্দায় এসে বসতি স্থাপন করেন। শাহ্ সুফি গাজী আলীর আগে এ গ্রানে আর কেউ বসতি স্থাপন করেননি। শ্রীকাইল মৌজার দক্ষিণাংশে ফসলি মাঠের কিছু কান্দা জমি (আউস/পাট চাষের জমি) ক্রয় করে বাড়িঘড় নির্মাণ করে বসতি গড়ে তোলেন। তাদের পরিবারই এই গ্রামের প্রথম বসতি। এই বসতিকে আবর্তন করেই গড়ে ইঠেছে আজকের সমৃদ্ধ জনপদ সোনাকান্দা।


            তাদের বংশপরস্পরা হলো হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী (র), তার বাবা শাহ্ সুফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সি, তার বাবা শাহ্ সুফি গাজী আলী, তার বাবা আয়িদা গাজী, তার বাবা নাতওয়ান গাজী, তার বাবা গাজী মুন্সি মোহাম্মদ রেজা। পীরসাহেব হফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর বাবা শাহ্ সূফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সি ছিলেন একজন তরিকতপন্থি আলেম আবং বাংলায় মাইনর পাস। তিনি হাদিয়ে বাঙ্গাল হজরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরীর (১৮০০-১৮৭৩) সুযোগ্য পুত্র হজরত মাওলানা হাফেজ আহম্মদ জৌনপুরীর (রহ্) মুরিদ ছিলেন। তিনি সোনাকান্দার পাশর্^পর্তী শ্রীকাইল মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন (শ্রীকাইল মাইনর স্কুলই ক্যাপ্টেন ডাক্তার নরেন্দ্রনাথ দত্তের উদ্যোগে কালক্রমে শ্রিকাইল কৃষ্ণকুমার হাই স্কুলে উন্নীত হয়। শ্রীকাইল এলাকায় হিন্দু- মুসলিম শিক্ষিত সমাজের প্রায় সকলেই ছিলেন তার ছাত্র। ঐতিহ্যবাহী শ্রীকাইল সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন ডাক্তার নরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার জ্যেষ্ঠ ভাই পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার দত্তও ছিলেন তার ভক্ত। সে হিসেবে সোনাকান্দার পীর হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর (র) প্রতিও শ্রীকাইলের হিন্দুরা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।


            শ্রীকাইল ইউনিয়নের সমৃদ্ধ গ্রাম ভূতাইলের প্রখ্যাত আলেম ইউসুফ আলী মোল্লা ছিলেন সে গ্রামের এক অভিজাত পরিবারের সদস্য। আরবি ও ফারসি ভাষায় অভিজ্ঞ ইউসুফ আলী মোল্লা ছিলেন জৌনপুরী সিলসিলার মুরিদ। তিনি নিজ হাতে কোরআন শরিফ নকল করতেন। সোনাকান্দা শাহ্ সুফি গাজী আলীও ছিলেন জৌনপুরের মুরিদ।


            শাহ্ সুফি গাজী আলীর ছেলে শাহ্ সুফি গাজী আফাসার উদ্দিন মুন্সিকে ভূতাইল গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লার মেয়ে নাওয়াজা খাতুনের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। নাওয়াজা খাতুন তার বাবার নিকট থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ সহীহভাবে শুদ্ধ উচ্চারণে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। গাজী আফসার উদ্দিন মোন্সি ও নওয়াজা খাতুন দম্পতির ছিল তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেরা হলেন জহির উদ্দিন (শিশুকালে প্রয়াত), আবদুর রহমান ও আবদুর বারী। মেয়েরা হলেন সুফিয় খাতুন ও লালের মা । শাহ্ সুফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সির কনিষ্ঠ ছেলে মাওয়ালানা আবদুল বারীর বিয়ে হয় নবীনগর থানার রতনপুর গ্রামের কাজী তাসলিম উদ্দিন মেয়ে তাছলিমা খাতুনের মেয়ের সাথে। মাওলানা আবদুর বারী ও তাসলিমা খাতুন দম্পতির ছেলেরা হলেন আবদুল লতিফ, মাওলানা আবু নসর মোহাম্মদ আবদুর নুর (পীরকাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত হেড মাওলানা), হাবিবুর রহমান ও শাহদ উল্লাহ। শাহ্ সুফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সির মেয়ে দু’জনের মধ্যে সুফিয়া খাতুনের বিয়ে হয় বাঙ্গরা পূর্ব ইউনিয়নের সীমারনার পাড় গ্রামের মাওলানা আবদুল মজিদের সাথে আর লালের মার বিয়ে হয় চাপিতলা ইউনিয়নের খাঁপুরা গ্রামের হাফেজ আলীম উল্লাহর সাথে। হফেজ আলীম উল্লাহ চাকরিসূত্রে আকুবপুর ইউনিয়নের কুড়েরপাড় হাফেজিয়ার মাদ্রাসার (কুড়েরপাড় গ্রামের মাহমুদ হোসেনের ছেলে মুলুক হোসেন কর্তৃক ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) বড় হফেজ পদে ছিলেন। বড় হাফেজ আলীম উল্লাহ পরে নিজ গ্রামে খাঁপুরা থেকে কুড়েরপাড় চলে এসে মাদ্রসার কাছেই পুকুরসহ বাড়ি ও জমিজমা ক্রয়ের পর বসতি স্থাপন করে স্থায়ী হন (বর্তমানে কুড়েরপাড় বিশ^বিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষের অফিসের উত্তরে কলেজ রোডের উপারে অবস্থিত তার সেই বাড়িতে তার উত্তরসুরিরা বসবাস করে)।


            শাহ্ সুফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সির জীবিত ছেলেদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর জন্ম ১৯০০ সালে (১৩০৬ বঙ্গাব্দ) সোনাকান্দায়। বাবার কাছেই তার লেখাপড়ার হতেখরি হয়। সোনাকান্দার পাশের গ্রাম রাজনগরের আম্বর আলী মুন্সির মুক্তবে কিছুদিন লেখাপড়া শিখেন। পরে তিনি গিয়ে ভর্তি হন শাহেদাগোপ মুক্তবে। শাহেদাগোপ মুক্তবে তিনি পবিত্র কোরান শরিফ শিক্ষা লাভ করেন। মেধাবী হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী প্রাথমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়ার ভিতরেই বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, আরবি, ফারসি ও উর্দুতে বেশ দক্ষতা আর্জন করে ফেলেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে তিনি চলে যান কুমিল্লার চান্দিনার হারং মাদ্রাসায়। হারং মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ইদ্রিস আহমদের তত্ববধানে তিনি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণ করেন।


            পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় বাবার আগ্রহে হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীকে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে হয়। মুরাদনগর উপজেলার টনকী ইউনিয়নের টনকী গ্রামের মুন্সি আহসান উল্লাহ সরকার ছিলেন সোনাকান্দার শাহ্ সুফি গাজী আফসার উদ্দিন মুন্সির পীরভাই। তারা দুজনেই ছিলেন হজরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরীর পুত্র পুত্র হজরত মাওলানা হাফেজ আহমদ জৌনপুরীর মুরিদ। টনকী গ্রামের মুন্সি আহসান উল্লাহ সরকারের কন্যা সাহেরা খাতুনের সাথে হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফীর বিয়ে হয়।


            হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানফী উচ্চশিক্ষার্থে পরে ঢাকার আরমানিটোলার হাম্মাদিয়া মাদ্রাসায় আলীম স্তরে ভর্তি হন। আরমানিটোলার হাম্মাদিয় মাদ্রাসা থেকে তিনি প্রথম গ্রেডে বৃত্তি লাভ করে ১৯২৩ সালে (১৩৩০ বাঙ্গাব্দ) জামায়াতে উলা (ফাজিল) পাস করেন। ঢাকার আরমানিটোলা হাম্মাদিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা শেষে সেখানে শিক্ষকতার প্রস্তাব পেলেও তিনি সেখানে থাকেন নি ( ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায়  প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত এই মাদ্রাসাটি এখন আর নেই। ১৯৩৯ সালে এটি ছাত্রশূন্য হয়ে যায়। ১৯৪৩ সালে এটি হাম্মাদিয়া হাই স্কুল পরিণত হয়েছে)।


          বাবার নির্দেশে হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী আবার কুরআন শরীফ শুদ্ধভাবে শিক্ষার জন্য নোয়খালীর দৌলতপুরে ক্বারী মোহাম্মদ ইবরাহীমের নিকট যান। সেখানে তিনি দুই বছর কুরআন শরীফ শুদ্ধভাবে শিক্ষা লাভ করেন।


            দেবীদ্বার উপজেলার রসুলপুর গ্রামের তার মুরব্বি মৌলভী বক্স আলীই হাম্মাদিয়া মাদ্রাসায় না থেকে খামারগ্রাম এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান জন্য তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার পরামর্শই তিনি খামারগ্রাম একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ গ্রহন করেন। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে চলে আসেন বাঙ্গরা পূর্ব ইউনিয়নে এই খামার গ্রামে। বাঙ্গরা, খাঁপুরা ও খামারগ্রাম এই তিন গ্রামের মানুষের জন্য ১৯২৬ সালে (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী খামাগ্রামের মানুষের সহযোগীতায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেই মাদ্রাসার ছাত্রদের শিক্ষাদান করেন। হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী মাদ্রাসার পাশাপাশি একটি মসজিদ ও প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসা ও মসজিদের পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসা ময়দানে একটি ঈদগাহও প্রতিষ্ঠা করেন। খামারগ্রাম মাদ্রাসা পরিচালনার সময় তাঁর ছোট ভগ্নিপতি হাফেজ আলীম উল্লাহর বাড়ি খাঁপুরায় তিনি থাকতেন। আজীবন তিনি ঈদগাহে ইমামতি করেছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁরই সুযোগ্য সন্তান দরবারের পরবর্তী পীর হজরত মাওলানা আবুবকর মুহাম্মদ শামছুল হুদা (র) বাবার নির্দেশ মতে এ ঈদগাহের তত্ত¡াবধান ও ঈদের নামাযে ইমামতি করেছেন। হজরত মাওলানা আবুবকর মুহাম্মদ শামছুল হুদার (র) ইনেÍকালের পর তাঁর সন্তান বর্তমান সোনাকান্দা দরবার শরিফের গদিনসীন পীর শাহ্ সুফি হজরত মাওলানা মাহমুদুর রহমান (র) বাবার নির্দেশ মতে ঈদগাহে ইমামতি করে আসছেন এবং খামাগ্রাম খানকা, মাদ্রাসা ও মসজিদের সার্বিক তত্ত¡াবধান করে আসছেন। প্রতিবছর রোজার সময় পীরসাহেব এই মাদ্রাসা মসজিদে ইতিকাফে বসেন। এই প্রথা হজরত হাফেজ আবদুর রহমান হানাফীর (র) সময় থেকে চলে এসেছে এবং এখনও বহাল আছে। সারা দেশ থেকে আসা পীরসাহেবের খলিফা, মুরিদ, ও ভক্তরা মিলে তিন শতাধিক রোজদার রমজানের শেষ সাত দিন মাদ্রাসা মসজিদে (মাদ্রসা ভবনসহ) ইতিকাফে বসেন। এ বিপুল সংখ্যক রোজাদার মুসল্লির ইতিকাফে বসার নজির বাংলাদেশে একমাত্র এটাই।


            মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর ইউনিয়নের ভুবনঘর গ্রামের অ্যাডভোকেট আবদুস সোবাহান ওরফে আবদু মিয়ার কুমিল্লা শহরের কাছারির কাছে ছোটরার বাসভবনে তশরিফ এনেছিলেন ফুরফুরা শরিফের পীর মোজাদ্দেদে জামানা হজরত আবুবকর সিদ্দিকী (র)। তাঁর নিকট ১৯২৯ সালে হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী বায়েত হন। ১৯৩৫ সালে (১৩৪২ বঙ্গাব্দে) তিনি হিজব্রত পালন করার উদেশ্যে মক্কা শরিফে যান। হজে যাওয়ার সময় তিনি খামারগ্রাম মাদ্রাসায় দায়িত্বভার তার ভগ্নিপতি সীমানারপাড় গ্রামের মাওলানা আবদুল মজিদের হাতে নাস্ত করে যান। দীর্ঘদিন মক্কা ও মদিন শরিফে অবস্থান করে তিনি দীনি ইলম গ্রহন করেন ও হজব্রত পালন করেন। তিন বছর পর ১৯৩৮ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তিনি ফরফুরা শরিফের পীর হজরত আবুবকর সিদ্দিকীর (র) নিকট থেকে ১৯৩৮ সালে খিলাফত লাভ করেন। আর তিনিই ছিলেন ফুরফুরা শরিফের পীরসাহেব হজরত আবুবকর সিদ্দিকীর (১৮৫৮-১৯৩৯) সর্বশেষ খলিফা।


            হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী নিজগ্রাম সোনাকান্দায় ১৯৪০ সালে হফেজিয় ফোরকানিয়া মাদ্রাসা পতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৫ সালে সোনাকান্দা মাদ্রাসা ওল্ড স্কিম জুনিয়র বা দাখিল মাদ্রাসায় উন্নীত হয়। ১৯৫৮ সালে এই মাদ্রাসা সিনিয়র মাদ্রাসায় উন্নীত হয়ে আলীম মঞ্জরীপ্রাপ্ত হয়। ১৯৬০ সালে এটি দরজালে ফাজিলে উন্নীত হয়। পীরসাহেবের মুরিদ, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী অ্যাডভোকেট মফিজ উদ্দিন আহমদের সহযোগীতায় ১৯৬৩ সালে ফেব্রæয়ারি মাসে (১৩৭০ বঙ্গাব্দের ১৬ই ফল্গুন) সোনকান্দা বহুমুখী ফাজিল মাদ্রাসায় কামিল বা টাইটেল (¯œাতকোত্তর) শ্রেণীর ম্ঞ্জরী লাভ করে। ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাী দত্ত প্রতিষ্ঠিত শ্রীকাইল কলেজটি ১৯৬৩ সালে পুনরায় চালুর বিষয়ে হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন।


            হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী দেশ-বিদেশের বহু স্থানে ভ্রমন করেছেন। তা ছাড়া ইসলামে প্রচার কালে তিনি দেশের নানা স্থানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তালিমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। সোনাকান্দা দারুল হুদা বহুমুখী কামিল মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তোলেন দারুল হুদা দরবার শরিফ, মসজিদ, ডাকঘর, কুতুবখানা, সাহেরা রহমান হেফজখানা, কেজি নূরানী মাদ্রাসা, খানকায়ে সিদ্দিকিয়া, লিল্লাহ বোর্ডিং, মুসাফিরখানা ও কবরস্থান। আঞ্জুমানে মঈনুল মুসলিমিন নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন তিনি গড়ে তুলেছিলেন।


            সোনাকান্দা দারুল হুদা বহুমুখী কামিল মাদ্রাসা ও দরবারের বার্ষিক ঈছালে ছাওয়াব মাহফিল প্রতিবছর ১৪ ও ১৫ ফাল্গুন (২৬ ও ২৭ শে ফেব্রæয়ারি) মাদ্রাসা ময়দানে অনূষ্ঠিত হয়। ২৯ আশি^ন হতে সাত দিন অনুষ্ঠিত হয় খাছছুল খাওয়াছ মাহফিল, ৫ই জৈাষ্ঠ মাহফিল, মাসিক মাহফিল, বছরের বরকতময় দিনগুলোর মিলাদ কিয়াম মাহফিল ইত্যাদিও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত বার্ষিক মাহফিলে দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে সোনাকান্দার মাহফিল ময়দানে দোয়া প্রত্যাশায় হাজির হতে দেখা যায়।


            মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী (র) যেমন ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক, সফল ও সুযোগ্য শিক্ষক, কামিল পীর, তেমনি ছিলেন একজন সাহিত্যসেবী, সূজনশীল লেখক ও গবেষক। ইসলামের সেবায় সকল ক্ষেত্রেই তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি ওয়াজ নসিহত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি গ্রন্থ রচনাতেও ছিলেন সমান মনোযোগী। একজন মানুষের রচনাবলি, তার আদর্শ ও শিক্ষাকে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হলে তার মাধ্যেমে তিনি অমর হয়ে থাকতে পারেন। তার শরিয়ত ও তরিকতের জ্ঞানকে তিনি গ্রন্থাকারে রেখে গেছেন যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ তার জ্ঞান ও আদর্শ দ¦ারা ইসলামের সঠিক আদর্শ অর্জনের মাধ্যেমে উপকৃত হতে পারেন। তার প্রকাশিত রচনাবলির মধ্যে আনিছুত্তালেবিন ১ম-৫ম খÐ, যাদুর হুজ্জার, আকসামুল মুসলেমীন, চারি তরিকার অজিফা ও শাজারা, দোয়ায়ে হিযবুল বাহার (উর্দু), অজিফায়ে নাফেয়া (উর্দু), অসিয়তনামা, শামসুল কোরআন, আরবের সফরনামা ইত্যাদি অন্যতম।


            হজরত মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী (র) পারিবারিক জীবনে ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, আদর্শ বাবা, এবং আদর্শ গৃহকর্তা। হজরত মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী (র) ও সাহেরা খাতুন দম্পতির ছিল চার ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে। তারা হলেন মোসাম্মৎ ফাতেমা খাতুন, আবদুল আওয়াল  (কৈশোরে মৃত). মোসাম্মৎ জাহেরা খাতুন, মোসাম্মৎ জামিল খাতুন, মোসাম্মৎ জোবেদা খাতুন  কৈশোরে মৃত) আবুবকর মোহাম্মদ শামছুল হুদা, আবু সাইদ সুলতান আহমেদ, সকিনা খাতুন ও আবু নসর মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস।


            হজরত হাফেজ মাওলানা আবদুর রহমান হানাফী (র) তাঁর খলিফা, ভক্ত, মুরিদগণকে শোকসাগরে ভাসিয়ে এই নশ^র ধরাধাম ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে ১৯৬৪ সালের ১৮ই মে (৫ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১ বাংলা, ৫ই মহররম ১৩৮৪ হিজরি) রোজ সোমবার পরপারে পাড়ি জমান।

Post a Comment

0 Comments