কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পীরকাশিমপুর। সূচ‘নাতে গ্রামের নাম ছিল কাশিমপুর। হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি পীর খ্যাতি লাভ করার পর শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ গ্রাবাসী ঐকমত্য হয়ে নিজেদের গ্রামের নামকরণ করেন পীরকাশিমপুর। শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও ইসলামের সেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কারণে পীরকাশিমপুর গ্রামটি যথেষ্ট সুনাম ও শ্রদ্ধার আসনে রয়েছে।
পীরকাশিমপুর গ্রামের কৃতি সন্তান হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি (র) বড় পীরসাহেব হিসেবে সকলের নিকট শ্রদ্ধেয়। হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতির বাবা ছিলেন নাসির উদ্দিন মোল্লা। নাসির উদ্দিন মোল্লা ছিলেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মাধপুর ইউনিয়নের রানীগাছ গ্রামের আধিবাসী। নাসির উদ্দিন মোল্লার মাতামহ ছিলেন পীরকাশিমপুর গ্রামের রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা (বাবা বাছির উদ্দিন মোল্লা)। রিয়াজ উদ্দিন মোল্লার ছিল এক ছেলে নোয়াব আলী মোল্লা আর এক মেয়ে (নাম জানা যায়নি)। এই মেয়েরই বিয়ে হয়েছিল ব্রাহ্মণপাড়ার মাধবপুর ইউনিয়নের রানীগাছ গ্রামে। সেই মেয়ের ছেলেই হলেন নাসির উদ্দিন মোল্লা।
নাসির উদ্দিন মোল্লার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি তার গ্রাম রানীগাছ ছেড়ে মামার বাড়ী পীরকাশিমপুর এস স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। নবীনগর থানার শিবপুর ইউনিয়নের মিরপুর গ্রামের মেয়ে মোমেনা বেগমের সাথে তার বিয়ে হয়। নাসির উদ্দিন মোল্লা ও মোমেনা বেগম দম্পতির ছিল তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেরা হলেন হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্ম্দ নাজীবুদ্দিন চিশতি (১৯৭৭-১৯৪০), হজরত খাজা শাহ্ আখতারুজ্জামান চিশতি (১৮৮০-১৯৩১), হজরত খাজা শাহ্ শামছুজ্জামান চিশতি (১৮৮৬-১৯৬২)। নাসির উদ্দিন মোল্লা ও মোমেনা বেগম দম্পতির একমাত্র কন্যার নাম ছিল মজলিশের মা। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধরপুর ইউনিয়নের মকিমপুর গ্রামের সুজাত আলী খানের সাথে মজলিশের মার বিয়ে হয়েছিল। সুজাত আলী খান ও মজলিশের মা দম্পতির ছিল তিন ছেলে। তারা হলেন- খলিলুর রহমান খান (কান্দু মিয়া), সাঈদুর রহমান খান (সৈয়দ মিয়া) এবং কুতুবুর রহমান খান (মাক্কু মিয়া)। খলিলুর রহমান খান হেকিমি পাস করে ব্যবসাসূত্রে কলকাতায় অবস্থানকালে প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে রাজনৈতিক সুবাদে ঘনিষ্টতা ছিল। সেই ঘনিষ্টতার সূত্র ধরে কান্দু মিয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে তার মামাবাড়ি পীরকাশিমপুরে দাওয়াত করেছিলেন। সেই দাওয়াত রক্ষা করতে গিয়েই ১৯৪৭ সালে মার্চ মাসের ১৫ তারিখ তিনি পীরকাশিমপুরে এসে ছিলেন এবং গ্রামের জিন্নাহ ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভার ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই জনসভায় পল্লীগীতি স¤্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমদ করি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত দুইটি ইসলামী সংগীত ( এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি এবং বাজিছে দামামা, বাঁধ রে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান) গেয়ে জনতার মন জয় করেছিলেন।
খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ আজীবুদ্দিন চিশতি প্রথমদিকে মামাবাড়ি নবীনগরের মীরপুরে লেখাপড়া করেন। পরে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হন। তিনি ছাত্র হিসেবে খুব মেধারী ছিলেন। মাদ্রসায় শেষ পরীক্ষায় অসাধারণ রেজাল্টের জন্য তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। তারা তিন ভাই-ই ছিলেন ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ও আলোকিত মানুষ। তারা সকলেই ছিলেন তখনকার বোম্বাই প্রদেশ বর্তমান মহারাষ্ট্রের সর্বদক্ষিণের সিন্ধুদুর্গ জেলার অধীন আরব সাগর বিধৌত মাসুরা এলাকার পীরসাহেব হজরত খাজা শাহ্ মোহাম্মদ শামছুদ্দিন হোছায়েনী চিশতির (শাহানশাহ্ পাক) মুরিদ।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে একের পর এক ফকির-অলি ও সুফি-দরবেশদের আগমন ও অবস্থানের ফলে এই মাসুরা গ্রামে অনেক খানকাহ ও মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই গ্রামটি মোম্বাই শহর থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে উপকুলীয় এলাকায় অবস্থিত। দাক্ষিণাত্যের বিজাপুরের (রাজধানী) আদিল শাহীর আমলে (১৪৯০-১৬৮৬) মাসুরার নাম ছিল মাহমুদাবাদ। মাসরার পীরসাহেব হজরত খাজা শাহ্ মোহাম্মদ শামছুদ্দিন আল হোছায়নী চিশতি (শাহানশাহ্ পাক) এসলামের প্রচারকাজে দেশের প্রত্যন্ত আলাকা ভ্রমণের একপর্যায়ে ঢাকায় আসেন। মাসুরার পীরসাহেবের সাথে সেই সময়ে ঢাকায় পরিচিত হন খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি। মেধাবী ও ইসলামের প্রতি অতিমাত্রায় অনুরাগী খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতিকে মাসুরার পীরসাহেব শাহানশাহ্ পাকের বেশ পছন্দ হয়। পীরসাহেব তাকে মুরিদ করে দেন। পরে তিনি তাকে খিলাফতও দান করেন। খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি তার পীরসাহেবের সাথে থেকে ভারতবর্ষের নানা স্থানে দীর্ঘ দিন ব্যাপক ভ্রমন করেন এবং ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। একই সময় হজরত খাজা শাহ্ আখতারুজ্জামান চিশতি ও হজরত হজরত খাজা শাহ্ শামছুজ্জামান চিশতিও মাসুরার পীরসাহেব শাহানশাহ্ পাক হজরত খাজা শাহ্ মোহাম্মদ শামছুদ্দিন আল হোছায়েনী চিশতির মুরিদ হয়েছিলেন।
হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতির প্রথম বিয়ে হয় ঢাকায়। প্রথমা স্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান। স্বামীর সাথে উত্তরবঙ্গ সফরকালে অকস্মাৎ রোগগ্রস্ত হয়ে মারা যান। নাটোরের মাটিয়াপাড়া নামক স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী রহিমা খাতুন ছিলেন ভারতের কর্নাটকের (সাবেক মহীশূর) ধারাওয়াড় জেলার মেয়ে। কর্নাটকের ধারাওয়াড় ও মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ জেলার মধ্যে দুরত্ব বেশি নয়, মাঝে কেবল কর্নাটকের বেলগাঁও জেলা। কর্নাটকের সংস্কৃতিবান এলাকা ধারাওয়াড় আবর শিল্প ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও বেশ পরিচিত। ধারাওয়াড় কথার মানি হচ্ছে দীর্ঘ ভ্রমণের পর বিশ্রামের স্থান। সংস্কৃত ভাষায় ধারাওয়াড় মানি শহরে প্রবেশের দ্বার। বর্তমানে শিল্পায়নের দিক দিয়ে কর্নাটর রাজ্যে ব্যাঙ্গালোরের পরেই ধারাওয়াড়ের স্থান।
কর্নাটকের ধারাওয়াড়ের মেয়ে রহিমা খাতুনের গর্ভে কারিমুন্নেছা ও আমেনা বেগম নামে দু’জন কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বয়ঃপ্রাপ্তির পর পীরসাহেবের জ্যেষ্ঠ ভাগিনা হেকিম খলিলুর রহমান খান কান্দু মিয়ার সাথে প্রথমা কন্যা কারিমুন্নেছার বিয়ে দেওয়া হয়। কারিমুন্নেছা নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হলে কান্দু মিয়ার দ্বিতীয় ভাই সাঈদুর রহমান খান ওরফে সৈয়দ মিয়ার সাথে তার আবার বিয়ে হয়। আর আমেনা বেগমের বিয়ে হয় সৈয়দ মিয়ার কনিষ্ঠ ভাই কুতুবুর রহমান খান ওরফে মাক্কু মিয়ার সাথে।
দীর্ঘ তিন দশক পর হজরত খাজা আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি গ্রামের বাড়ি কাশিমপুরে আসেন। এতোমধ্যে মেজ ভাই হজরত খাজা শাহ্ আখতারুজ্জামান চিশতি ও হজরত খাজা শাহ্ শামছুজ্জামান চিশতি কাশিমপুরে অবস্থান করে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করে বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন। বড় পীর হিসেবে খ্যাত হজরত খাজা আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি ঢাকার পোস্তগোলার জুরাইনে স্থানীয়দের দান করা জায়গায় খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস করেন। ঢাকায় পোস্তগোলার জুরাইনেই ১৯৪০ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। তিনি জুরাইনে সমাহিত হন। জুরাইনে তার মাজার রয়েছে। হজরত খাজা শাহ্ আখতারুজ্জামান চিশতি ও হজরত খাজা শাহ্ শামছুজ্জামান চিশতি নিজ গ্রামে পীরকাশিমপুরেই অবস্থান করতেন এবং তারা নিজ বাড়িতেই মারা যান। পীরকাশিমপুরে তাদের মাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
হজরত খাজা শাহ্ আখতারুজ্জামান চিশতি (র) ছিলেন চিরকুমার। হজরত খাজা শাহ্ শামছুজ্জামান চিশতি (র) ও নূরুন্নেছা দম্পতির ছেলেরা হলেন ১. হজরত খাজা শাহ্ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চিশতি (গদিনসীন পীর), ২. মোহাম্মদ জানে আলম চিশতি, ৩. মোহাম্মদ জহুরুল আলম চিশতি (মুরাদনগরের সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান), ৪. মোহাম্মদ শাহ্ আলম চিশতি, ৫. মোহাম্মদ নজরুল আলম চিশতি। মোহাম্মদ নজরুল আলম চিশতি পীরসাহেবদের নামে মুরিদানদের দেয়া জায়গা জমি দেখাশোনার কাজে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খÐকোষ বøকের কেওদিয়া গ্রামে সপরিবারে বসবাস করে আসছেন। জানে আলম চিশতি প্রয়াত হয়েছেন। তাদের অবশিষ্ট ভাইদের সবার অবস্থান বাংলাদেশে।
0 Comments