খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি ও মুক্তিযুদ্ধে চাপিতলা

কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পীরকাশিমপুরের প্রখ্যাত বুজুর্গানে দীন পীর কামেল হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র) ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বলতে গেলে এক অকুতোভয় সৈনিক। ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ


যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই করা কীভাবে শিখবে? যারা পানিতে ডুবে যাওয়ার ভয়ে তার সন্তানকে ডোবায় নামতে দেয় না, কীভাবে সে সন্তান আটলান্টিক পাড়ি দেবে? (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক)।


            ফকির আফতার উদ্দিন খাঁ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার নবীনগর উপজেলার শিরপুর গ্রামের একটি সংগীত পরিবারের সন্তান। তার বাবা সবদর হোসেন খাঁ ও মা সুন্দরী বেগম। তার বড় ভাই ওস্তাদ ছমির উদ্দিন খাঁ আর ছোট ভাই সংগীত স¤্রাট ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। নবীনগর উপজেলার সাতমোড়া গ্রামের মলয়া গানের ¯্রষ্টা সাধককবি মনোমহন দত্তের (১৮৭৭-১৯০৯) ভক্ত ও মোনমোহন দত্ত রচিত ‘মলয়া’ গানের সুরকার এবং গায়ক ছিলেন তিনি। ত্রিপুরার আগরতলা রাজসভার সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আসিম আলীর খাঁর কাছে তিনি সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার শ্রীরামপুরের ওস্তাদ গুল মাহমুদের কন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার ছিল তিন মেয়ে। মেয়েরা হলেন কমলা, চপলা, ও ইন্দ্রবালা। তার গুণি মেয়ে কমলা-উন-নেসার ছেলে ছিলেন বিখ্যাত ওস্তাদ ফুলঝুরি খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। ওস্তাদ ফুলঝুরি খাঁ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের সংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দাযিত্ব পালন করেন। সাধক কবি ও গীতিকার মনোমোহন দত্তের মৃত্যুর পর ফকির আফতার উদ্দিন খাঁ (১৮৬২-১৯৩৩) গ্রামে গ্রামে ঘুরে গেয়ে গেয়ে মনোমোহন দত্তের রচিত ভাব-সংগীত, যা তার ভক্তদের কাছে ‘¯িœগ্ধ দক্ষিণ বাতাস’ বা ‘মলয়া’ নামে পরিচিত গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন।


            ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁর ছোট ভাই আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে ড. আলী আকবর খাঁ (জন্ম : ১৯২২) বিশ^খ্যাত সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ওস্তাদ আলউদ্দিন খাঁর মেয়ে রওশন আরা বেগম (জন্ম : ১৯২৭) প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ছিলেন। তার বিয়ে হয়েছিল নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার কৃতী সন্তান বিশ^খ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর চৌধুরীর (১৯০০-৭৭) ছোট ভাই পÐিত রবীন্দখালি হাতে আকদম হিং¯্র পাকিস্তানি সেনার সামনে যে ভাবে আস্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন এক কথায় তা ছিল অভাবনিয়। তার নির্ভীকতার কারণে একটি গ্রাম ও গ্রামের মানুষের জানমাল সতভাগ বেঁচে গিয়েছিল, অথচ কয়েক ঘন্টা মাত্র আগে তারা বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধা হারিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ও হিং¯্র মূর্তি নিয়ে অগ্রসরমান এই পাকিস্তান সেনাদের দ্ধারা তার নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাই ছিল বেশি। শ^াসরুদ্ধকর সেই ঘটনাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য ও উজ্জ্বল এক স্মৃতি হয়েই থাকবে চিরকাল।


            পীরসাহেব হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র) নিজ গ্রামে পীরকাশিমপুরে ১৮৭৬ সালে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবার নাম আয়েত আলী মুন্সি। আকুবপুর ইউনিয়নের পীরকাশিমপুর গ্রামের তাদের পূর্বপুরুষ তুফানির ছেলেরা হলেন মাহমুদ জান, পাÐব আলী ও হাজী আসাদ। মাহমুদ জানের ছিল দুই ছেলে- আয়েত আলী মুন্সি ও আরমান আলী মুন্সি। আয়েত আলী মুন্সির জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন পীরসাহেব হজরত মাওলানা খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র)। পীরকাশিমপুরের পাশের গ্রাম গাজীপুর হচ্ছে খাজা আবদুল গফুর চিশতির মামার বাড়ি। আয়েত আলীর মুন্সির ছেলেরা হলেন-মাওলানা খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র), খাজা শাহ্ আবদুস সামাদ চিশতি, আবদুল হামিদ (দারু মিয়া), তালেব আলী, আনিছুর রহমান মাস্টার, সামছুদ্দিন ও মোখলেছুর রহমান।


            হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র) যে অত্যধিক মেধাবী ছিলেন তা বাল্যকালেই প্রকাশ পেয়েছিল। ধর্মের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা প্রকাশ পাওয়ার কারণে তার বাবা ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষালাভের ্উদ্দেশ্যে তাকে মাদ্রাসায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামে প্রাথমিক লেখাপড়ার পর তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের দাউদপুর মাদ্রাসায় ভর্তি করিয় দেন। সেই মাদ্রাসায় তিনি যথেষ্ট আগ্রহ ও নিষ্ঠার সাথে পড়ালেখা শিখেন। তারপর তাকে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য পাঠানো হয় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি জামায়াতে উলা পাস করেন। হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র) পীরকাশিপুরের বড় পীরসাহেব হিসেবে পরিচিত হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহাম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি (র)-এর (ঢাকার জুরাইনে তার মাজায় অবস্থিত) নিকট বায়েত হন। পীরের আদেশে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর সাধনার পর তিনি সুফি তরিকায় অন্যতম স্তম্ম তরিকতের আনেক উঁচু স্তরে উপনীত হতে সক্ষম হন। হজরত খাজা শাহ্ আবুন্নাছরে মোহম্মদ নাজীবুদ্দিন চিশতি (র)-এর পীরসাহেব ভারতের মহারাষ্ট্রের আরব সগর বিধৌত সিন্ধুদর্গ জেলার মাসুরার হজরত খাজা শাহ্ মোহাম্মদ শামছুদ্দিন আল হোছাইনী চিশতি (শাহানশাহ্ পাক) এর সান্নিধ্য লাভে তিনি ধন্য হয়েছিলেন এবং তার ফয়েজ লাভ করেছিলেন। বাংলাদেশের বহু এলাকায় হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র)-এর মুরিদান রয়েছেন। তার কাছে এসে দোয়া প্রত্যাশীদের অনেককে তিনি পানিপড়া দিতেন। তাঁর পানিপড়া নাকি ছিল অব্যর্থ। তিনি বাংলাদেশের মোহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করেছিলেন জীবন বাজি রেখে, অতীব সাহসের সাথে।  ভক্তদের ধারনা, সেখানেও নাকি পুকুরে রাখা তার পানিপড়ার কেরামতি কাজ করেছে। তার


সাহসিকতার কারণে নিজ গ্রামে পুণ্যভুমি পীরকাশিমপুর হানাদার বাহিনীর রোষানলে জনমানবশূন্য এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া থেকে বলা যায় অলৌকিকভাবেই রাক্ষা পেয়েছিল।


            পাকিস্তান আর্মির কাছে খবর ছিল মুরাদনগর এলাকার মুক্তিবাহিনী কমান্ডার কামরুল হাসান ভূইয়া (ক্যাডেট কলেজের ছাত্র, পরে আর্মির অবসরপ্রাপ্ত মেজর) সদলবলে অবস্থান করেছেন পীরকাশিমপুর গ্রামে। পাকিস্তানি আর্মি পীরকাশিমপুর ক্যাম্পে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ৭ই নভেম্বর ১৯৭১ সড়কপথে এসে পৌছে চাপিতলা। চাপিতলার অহেদ আলী কেরানির সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী দ্বারা তারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। সেখানে গোলগুলিতে অহেদ কেরানিসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। মুক্তিযোদ্ধারা আগেই হানাদারদের আগমনের সংবাদ জেনে কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়কের চাপিতলা খালের ওপর নির্মিত পাকা ব্রিজের দুই পাশের মাটি সরিয়ে উত্তরপাশে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন। বিক্ষিপ্ত গোলাগুলিতে ৮ই নভেম্বর সারা দিন কেটে যায়। ৯ই নভেম্বর ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করে অগ্রসর হলে তাদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেইদিন রাজাকারসহ পাকিস্তানি বাহিনীর ৫৬ জন নিহত হয়েছিল, যার মধ্যে দুজন ছিল অফিসার। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে পুষ্করিণীর পাড়ের হাবিলদার রমিজ উদ্দিন, বলিঘরের আবুল বাশার আর কদমতলী গ্রামের বাচ্চু মিয়া শহীদ হন। রাজাকারসহ পাকিস্তানি বাহিনী সড়ক দরে উত্তরদিকে আগ্রসর হতে হতে কুড়েরপাড় ব্রীজের কাছে মেটংঘর সুজাত আলী ভূঁইয়ার বাড়িতে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে এসে উপস্থিত হয়। ক্যাম্পে রাতে অবস্থানকারী মেটংঘর ও কুড়েরপাড় গ্রামের যুবকেরা ভোরের দিকেই সরে পড়েন। পাকিস্তানিরা ক্যাম্পের একটি কক্ষে ইউনূছ আলী নামে মেটংঘরের একজনকে পেয়ে ধরে ফেলে এবং রাজাকারদের নিকট থাকা গুলির বাক্স বহন করার জন্য তাকে পীরকাশিমপুরের দিকে নিয়ে যায়। ইউনূছ আলী পীরকাশিপুর থেকে আবার কোম্পানীগঞ্জের দিকে ফেরার সময় মেটংঘর ক্যাম্পের কাছে আসার পর হঠাৎ মাথা থেকে গুলির বাক্স ফেলে দৌড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পীরকাশিমপুর গ্রামের ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা থানা কমন্ডার কামরুল হাসান ভূঁইয়ার নির্দেশে ক্যাম্পের নেতৃস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুছ ভ্ূঁইয়া ও আজহার হোসেন মানিকের নেতৃত্বে সকলেই পীরকাশিমপুর গ্রাম ছেড়ে অদেল খাল অতিক্রম করে পাশের থানা নবীনগরের দিকে নিরাপদ স্থানে সরে পড়ে। তাদের নিকট থাকা সব বন্দুক তারা গ্রামের পুকুরের পানিতে লুকিয়ে রেখে যান। এদিকে পীরসাহেব হজরত খাজা শাহ্ আবদুল গফুর চিশতি (র) যখন শুনলেন যে পাকিস্তানি বাহিনী পীরকাশিমপুর গ্রামে প্রবেশ করে তার বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে তখন তিনি নিজের জন্মস্থান রক্ষার্থে বাড়ির সামনের সড়কে এসে কয়েকজন খাদেমসহ সশরীরে অবস্থান নিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। রাজাকার কমান্ডার পীরসাহেবকে আগে থেকেই চিনত ও জানত। সে পাকিস্তানি বাহিনী কমান্ডারকে পীরসাহেব সম্পর্কে আগেই অবহিত করে। পীরসাহেবের চেহারা দর্শনমাত্র পাক বাহিনীর কমান্ডারের ভয়ঙ্কর ও হিং¯্র মূর্তি স্বাভাবিক হয়ে যায়। কমান্ডার পীরসাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কেন এলেন? পীরসাহেব ভালো ফাসি ও উর্দু জানেন। বললেন, আপনাদেরকে আমন্ত্রণ জানাতে উপস্থিত হয়েছি। পীরসাহেবের কথায় কমান্ডার শান্ত হলেন। পীরসাহেব কমান্ডারকে আপ্যায়নের কথা বললেন। তখন কমান্ডার বললেন, আপ্যায়নের প্রয়োজন নেই। আপনার দোয়া পেলেই আমরা ধন্য। বিশাল আয়োজনের পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনা পীরসাহেবের কাছে এসে ওলটপালট হয়ে যায়। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান ক্যাম্প আবদুল কুদ্দুছ ভূঁইয়ার বাড়িতে আগুন দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কমান্ডারের অভিপ্রায় জেনে পীরসাহেব বললেন, তার আগে আমার বাড়িতে আগুন দিতে হবে। পীরসাহেবের কথায় কমান্ডার লজ্জিত হলেন। পীরকাশিমপুরের কোনো বাড়িই পাকিস্তানি বাহিনীর আগুনে সেদিন পোড়ানো গেল না।


            হানাদার বাহিনীর কমান্ডার পীরসাহেবকে জিজ্ঞাসা করল এই গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে কি না। পীরসাহেব বললেন, এই গ্রামে মুক্তিবাহিনী আসে আবার চলে যায়। মানুষ ভয়ে তাদেরকে বাধা দেয় না। যেমন আপনারা এসেছেন আপনাদের ভয়ে মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অফিসার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল কুদ্দুছ ভূঁইয়ার বাড়ি (ক্যাম্প) পরিদর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করল। পীরসাহেব বললেন, ঠিক আছে তা করুন। সেখানে (ক্যাম্পে) গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী এদিক-ওদিক সবদিক অনেক তালাশ করেও মুক্তিযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া কোনো অস্ত্রই খুঁজে পায়নি। পীরসাহেবের পানিপড়ার কেরামতি এখানেও নাকি অনুধবন করা গেছে। ফেরার পথে কোনো ক্ষতি না করে তারা চলে যায়।


            হজরত খাজা শাহ্ মাওলানা আবদুল গফুর চিশতি (র) ছিলেন চিরকুমার। তিনি ১৯৭৫ সালের ২রা আগস্ট ৯৯ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। নিজ বাড়িতে তার মাজার রয়েছে। প্রতিবছর রজব মাসের ২২ ও ২৩ তারিখে তার স্মরণে ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। ওরস উপলক্ষে তার মাজারকে কেন্দ্র করে পীরকাশিমপুর গ্রামে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্তের সমাবেশ ঘটে।


Post a Comment

0 Comments